ঢাকা, ৩ আগস্ট ২০২৬: দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূ-কৌশলগত বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রচলিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ (সিপিএস) বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট হলে “বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা: নতুন ও পরিবর্তনশীল যুগে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ভাবনা” শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে।
সংলাপে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা কৌশলবিদ, নীতিনির্ধারক, সামরিক কর্মকর্তা এবং শিক্ষাবিদরা অংশ নেন। আলোচনায় জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, সাব-থ্রেশহোল্ড ও হাইব্রিড যুদ্ধের ঝুঁকি, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা এবং সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
উদ্বোধনী বক্তব্যে সিপিএস-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. এম. জসিম উদ্দিন বলেন, “জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং পরস্পরকে শক্তিশালী করে।” তিনি জাতীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সমন্বিত কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
প্রথম প্যানেলে প্রতিরক্ষা ও জোটনীতি বিষয়ে আলোচনা করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় (জিডিপির প্রায় ১.১ শতাংশ) দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় কার্যকর সামরিক জোট ও সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রণয়ন সময়ের দাবি। মেজর জেনারেল (অব.) ড. মো. নাঈম আশফাক চৌধুরীও প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দ্বিতীয় প্যানেলে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়। মেজর জেনারেল (অব.) ইবনে ফজল শায়েখুজ্জামান বলেন, শক্তিশালী সাইবার অবকাঠামো গড়ে তোলাই জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কৌশল বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত। মেজর জেনারেল (অব.) মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান বলেন, “জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তাকে যুক্ত করার এখনই উপযুক্ত সময়।”
তৃতীয় প্যানেলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নীল অর্থনীতির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। কমোডর (অব.) সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ বহুমাত্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। অধ্যাপক ড. এম. জসিম উদ্দিন বলেন, “আমরা একটি সামুদ্রিক জাতি; তাই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই সামুদ্রিক অঞ্চল সুরক্ষিত করা অপরিহার্য।” রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) এম. আনোয়ার হোসেন বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষা এবং সমন্বিত ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা প্রণয়নের আহ্বান জানান। পাশাপাশি একটি “সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিষদ” গঠনের সুপারিশ করা হয়।
সংলাপের প্রধান অতিথি জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, রাষ্ট্রের জন্য বন্ধু ও শত্রুকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, “নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে পারলে ছোট রাষ্ট্রও বৃহৎ শক্তিকে মোকাবিলা করতে সক্ষম।”
বিশেষ অতিথি মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর একটি কার্যকর জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এবং সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সমাপনী বক্তব্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ যখন দেশীয় গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সংলাপের মডারেটর অধ্যাপক ড. এম. জসিম উদ্দিন বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উচিত বাংলাদেশকে তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করা।
আলোচনার শেষে অংশগ্রহণকারীরা দেশের উদীয়মান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (এনএসসি) গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান। তাঁদের মতে, ভবিষ্যতের বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত, আধুনিক ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ হারুন-অর-রশিদ
বার্তা সম্পাদকঃ আশিক সরকার
Copyright © 2026 Bporikromanewsbd.com. All rights reserved.