তারেক রহমান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। যাঁর শুরুটা বেশ ভালো। সরল-সুন্দর-ব্যতিক্রমী আর আশা-জাগানিয়া। সাহসের সঙ্গে ভাঙলেন রাষ্ট্রীয় রীতি। নিজের নিরাপত্তায় অতি আনুষ্ঠানিকতা আর লটবহর কমালেন।
গণমানুষের চলার পথে বাধা হলেন না! জীবনযাপনকে সাধারণের কাতারে নামিয়ে আনার চর্চা জারি রাখলেন। এভাবে দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনেও একের পর এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিতে থাকলেন। নিজের দপ্তর থেকে কৃষকের মাঠ কিংবা সচিবালয় থেকে মুদি দোকান—সর্বত্র বার্তা দিতে শুরু করলেন—দুর্নীতি, লুটপাট আর যাবতীয় অব্যবস্থাপনার অবসান ঘটিয়ে এবার দেশটা সত্যিকার অর্থেই গড়ে তুলবেন। লন্ডন থেকে দেশে ফিরে ‘আমার একটি পরিকল্পনা আছে’ বলে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনকে ছুটি দিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার প্রত্যয় ঘোষণার মধ্য দিয়েই মূলত তিনি ‘নিজের কাজটি’ শুরু করে দেন।
সময়ের পরিক্রমায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে তারেক রহমান ঠিকই প্রধানমন্ত্রী হলেন; কিন্তু তাঁর চারপাশজুড়ে কেবলই সমস্যা আর সংকটের পাহাড়। পতিত আওয়ামী সরকারের রেখে যাওয়া অসংখ্য সমস্যার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থবির অর্থনীতিও পেলেন উত্তরাধিকার সূত্রে! ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থাহীনতা। হামলা-মামলা-নিরাপত্তাহীনতায় বিনিয়োগহীন উচ্চমূল্যস্ফীতিতে জনজীবন যখন প্রায় বিপন্ন, তখন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসলেন তারেক রহমান।
সমস্যা কি একটা দুটো? না, হাজারো সমস্যার মধ্যে পথচলা শুরু। তখনো ডলারসংকট কাটেনি। বেসরকারি খাতকে ডুবিয়ে কাঁচামাল ও শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানিতে তখনো মন্দাবস্থা। উচ্চমূল্যস্ফীতির উত্তাপে তখনো পুড়ছে মধ্যবিত্ত। ব্যাংকব্যবস্থা ভঙ্গুর। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির, তাই রাজস্ব আয়েও বড় ঘাটতি। কাঙ্ক্ষিত তহবিল নেই, ফলে দেশ চালাতে ধারকর্জই ভরসা। বিদেশি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংক থেকে নিতে হয় বিপুল অর্থ। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতিহীন। অন্তর্বর্তীর সময়ে বিনিয়োগে যে আস্থাহীনতা ছিল, তার ধাক্কাও কাটেনি। ওই সরকার বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মজুদ বাড়ানো কিংবা চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহব্যবস্থা রেখে যাওয়ার কথা, সেটিও রেখে যায়নি। বলা যায়, বাংলাদেশকে একটি ‘তছনছ’ অবস্থার মুখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে তুলে দিয়ে চলে যায় অন্তর্বর্তী সরকার।
এখন তারেক রহমান সরকারের ছয় মাস পার হতে না হতেই চারপাশের দৈন্যদশা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের ক্ষত বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। সারা দেশে চরম লোডশেডিং। শিল্প-কারখানায় কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ-গ্যাস মিলছে না। ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদনশীলতা কমেছে কারখানার। দিন দিন তা বাড়ছে। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যেও চাহিদা রাতারাতি খুব বাড়েনি। তার পরও মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং। গ্রামের সাধারণ মানুষ পড়েছে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে। এখন শহরেও লোডশেডিং পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বলা হচ্ছে, জ্বালানিসংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা আগের বকেয়া শোধের দাবি জানাচ্ছেন। তাঁরা তাঁদের ক্যাপাসিটি চার্জের জন্যও চাপ দিচ্ছেন। আবার এলএনজি টার্মিনালগুলো ঠিকমতো পারফর্ম করছে না। নানা অজুহাতে সেগুলো বেশ কিছুদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত গ্যাস সরবরাহ দিতে পারছে না। পরিস্থিতির ধরন দেখে এখন বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে এর নেপথ্যের আসল ঘটনা নিয়ে। খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সম্প্রতি এক জনসভায় জ্বালানি খাত অস্থির করতে একটি চক্র ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেছেন। সরকারের আরো বেশ কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তিও এমন অভিযোগ তুলেছেন। চারপাশের চিত্র দেখে মনে হচ্ছে, এমন অভিযোগ একেবারেই অমূলক নয়।
এটা ঠিক, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে এক ধরনের অস্থিরতা চলছে। সরবরাহব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তার কিছুটা প্রভাব আছে। কিন্তু এখন ওই সব কারণকে অজুহাত হিসেবে সামনে এনে পুরো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অস্থির করার একটি অপচেষ্টা চলছে বলে মনে হচ্ছে।
বিভিন্ন উপসর্গ বলছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভেতরের একটি চক্র, বিশেষ করে সচিবালয়ের কিছু কর্মকর্তা, বিপিসির কিছু কর্মকর্তা, পতিত আওয়ামী সরকারের একটি অসাধু গোষ্ঠী ও বিরোধী রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী একটি মহল জোটবদ্ধ হয়ে তারেক রহমানকে ব্যর্থ করার এটি একটি অপচেষ্টা হতে পারে। একটি সরকারের ক্ষমতা নেওয়ার মাত্র ছয় মাসেই বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে এমন সংকট তৈরি করা অস্বাভাবিক। শোনা যায়, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কিছু কম্পানির ক্যাপাসিটি চার্জ শোধ এবং এর সঙ্গে ‘কমিশনের’ ভাগ পাওয়া নিয়ে একটি চক্র দেনদরবার করছে। এ চক্রটি মূলত সচিবালয়ে প্রশাসনের ভেতরের পতিত আওয়ামী সরকারের লেজুরবৃত্তি করা একটি অংশ বিরোধী দল মতাদর্শের আরেকটি গোষ্ঠীর একটি জোট। তারা যোগসাজশ করে পরিস্থিতি ঘোলা করতে চাচ্ছে। তাদের চক্রান্তেই লোডশেডিং চরম পর্যায়ে নিয়ে মানুষকে খেপিয়ে তারেক রহমান সরকারকে ব্যর্থ করতে পারলে হয়তো বাংলাদেশে দীর্ঘদিন পর যে গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হয়েছে, তা থামিয়ে দেওয়া যাবে। বলা যায় না, এটি তাদের ‘গুপ্ত মিশনও’ হতে পারে!
ওয়ান ইলাভেন-পূর্ব বিএনপি সরকারের পতনের একটি বড় কারণও ছিল বিদ্যুত্সংকট। এ সময় বিক্ষুব্ধ মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। তখনো এই ইস্যুতে সরকারবিরোধী মনোভাব জোড়ালো হয়। বিদ্যুত্সংকটে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ধসে পড়ে, লোডশেডিং চরমে পৌঁছলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনও স্থবির হয়ে যায়। এটাকেও ওই অসাধু চক্রটি কাজে লাগায়। এ শিক্ষাটিই তারেক রহমান সরকারকে মাথায় নিতে হবে। পুরো বিষয়টির একটি বাস্তবভিত্তিক পর্যালোচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যে অসাধু চক্রটি এ খাতকে অস্থির করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়, তা পরিস্থিতির উন্নতির মধ্য দিয়ে অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিশেষ করে বিপিসিসহ আরো যেসব সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে পতিত আওয়ামী সরকার ও বর্তমান বিরোধী মতাদর্শের মধ্যে যারা যারা পরিস্থিতি ঘোলা করতে চাচ্ছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্জের ‘কমিশন’ খাওয়ার জন্য যে অদৃশ সিন্ডিকেট গড়ে উঠছে, তাও ভেঙে দিতে হবে।
সরকারকে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কম্পানিগুলোর উদ্যোক্তাদের ডেকে কড়া আলটিমেটাম দিতে হবে। সরকারের অর্থসংকট থাকলেও এমন কোনো পরিস্থিতি হয়নি যে দায় শোধ করা যাবে না। তাদের পাওনা টাকা কিস্তি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতির উন্নতি করার নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৭ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। সুতরাং ওই ডলার খরচ করে সরকার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনে আনতে পারে। শিল্প-কারখানাগুলো গ্যাসসংকটে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন করতে পারছে না। উৎপাদন ব্যাহত হলে পুরো সাপ্লাই চেইনে প্রভাব পড়বে এবং রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে। এটি যেন কোনোভাবেই না হয়, সে জন্য জ্বালানি খাতের জন্য ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা কার্যকর করতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি প্যানেল করা যেতে পারে। ওই প্যানেল বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট মেটাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের ভেতর থেকে এমন কোনো বার্তা না দেওয়া, যাতে সবার মধ্যে ভুল বার্তা যায় ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্প্রতি দুজন মন্ত্রী আগামী দুই বছরের আগে বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হবে না বলে নির্বিকারভাবে এমন মন্তব্য করায় সবার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এটি সরকারের সক্ষমতা সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দেয়। এ ধরনের মন্তব্য করা থেকে দায়িত্বশীলদের বিরত থাকা দরকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যে আশা জাগানিয়া আগমন, তা টেকসই করতে হলে সচিবালয় ও বিপিসিসহ প্রশাসনের ভেতরের অসাধু চক্রটিকে চিহ্নিত করতে হবে। এ গুটিকয়েক ষড়যন্ত্রনষ্ক কর্মকর্তার কূটচালের কারণে যাতে পুরো বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত না হতে পারে, সে জন্য কঠোর নজরদারি করতে হবে। দেশ গঠনের সবেমাত্র যাত্রা শুরু হয়েছে। এটি যাতে অনেক দূর নিয়ে যাওয়া যায়, সে লক্ষ্যে পুরো সরকারব্যবস্থা ও অংশীদার হিসেবে বেসরকারি খাতকেও পাশে রাখতে হবে। ষড়যন্ত্রকারী রাজনৈতিক অসাধু চক্র যাতে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে, সেদিকেও সদাসতর্ক থাকতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ হারুন-অর-রশিদ
বার্তা সম্পাদকঃ আশিক সরকার
Copyright © 2026 Bporikromanewsbd.com. All rights reserved.