Home ব্রেকিং দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে জাহালমকে ঘরে তুললেন মা

দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে জাহালমকে ঘরে তুললেন মা

4
0
SHARE

বিশ্ববিদ্যায়ল পরিক্রমা ডেস্ক : জালিয়াতির ৩৩টি মামলায় ভুল আসামি হয়ে তিন বছর কারাভোগের পর অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন পাটকল শ্রমিক জাহালম। রোববার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাত ১২টা ৫৮ মিনিটের দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।

সোনালী ব্যাংকের অর্থ জালিয়াতির অভিযোগে দুদকের করা সব মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে রোববারই নিরীহ জাহালমকে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। আদেশের কাগজ কারাগারে পৌঁছানোর পরপরই মুক্তি পান তিনি। মধ্যরাতে জেল থেকে বেরিয়েই গেটে দাঁড়ানো শাহানুর মিয়াকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন দুই ভাই। সেখান থেকে ভোর ৪টায় গ্রামের বাড়িতে আসেন তারা।

ছেলের অপেক্ষায় তিন বছর নির্ঘুম মা মনোয়ারা এদিন ছিলেন অধীর আগ্রহে বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে। দূর থেকে ঘন কুয়াশার মধ্যে মোবাইলের আলো দেখেই ছুটে এলেন তিনি। জাহালমকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন মনোয়ারা। ছেলের কপালে চুমু দিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন- ‘কার মাথায় বাড়ি দিছিলাম যে আমার এত বড় সর্বনাশ করেছিল।’

ততক্ষণে জাহালমকে জড়িয়ে ধরেছেন বোন শাহানা ও তাসলিমা। তাঁরাও আহাজারি করতে থাকেন, ‘আমার ভাই, কোন অন্ধকারে ছিলি এত দিন।’

তাদের চিৎকার-কান্না শুনে ছুটে আসেন প্রতিবেশীরাও। সবার চোখেই তখন আনন্দাশ্রু।

বিনাদোষে তিন বছর জেলে খেটে ফেরা জাহালমকে দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে ঘরে তোলা হয়।

প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য, গত ২৮ জানুয়ারি দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি দৈনিকে সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির ৩৩টি মামলায় নিরপরাধ জাহালমের জেলখাটা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আবু সালেকের (মূল অপরাধী) বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির ৩৩টি মামলা হয়েছে। কিন্তু আবু সালেকের বদলে জেল খাটছেন, আদালতে হাজিরা দিয়ে চলেছেন জাহালম। তিনি পেশায় পাটকল শ্রমিক।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি চিঠির মাধ্যমে জাহালমের ঝামেলা শুরু। জাহালমের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঠিকানায় দুদকের একটি চিঠি যায়। সেই চিঠিতে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় জাহালমকে হাজির হতে বলে দুদক। জাহালম তখন নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

দুদকের চিঠিতে বলা হয়, ভুয়া ভাউচার তৈরি করে সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত আবু সালেক নামের এক লোক, যার সোনালী ব্যাংক ক্যান্টনমেন্ট শাখায় হিসাব রয়েছে। আবু সালেকের ১০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ভুয়া ঠিকানাগুলোর একটিতেও জাহালমের গ্রামের বাড়ির কথা নেই। রয়েছে পাশের আরেকটি গ্রামের একটি ভুয়া ঠিকানা। কিন্তু সেটাই কাল হয়ে দাঁড়ালো জাহালমের জীবনে।

নির্ধারিত দিনে দুই ভাই হাজির হন দুদকের ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। জাহালম বুকে হাত দিয়ে বলেছিলেন, ‘স্যার, আমি জাহালম। আবু সালেক না। আমি নির্দোষ।’

দুদকে হাজিরা দিয়ে জাহালম সোজা চলে যান নরসিংদীর জুট মিলের কর্মস্থলে। এর দুই বছর পর টাঙ্গাইলের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে জাহালমের খোঁজ করতে থাকে পুলিশ। সেখান না পেয়ে ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশালের মিল থেকে জাহালমকে আটক করা হয়।

জাহালম তখন জানতে পারেন, তার নামে দুদক ৩৩টি মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে, তিনি বড়মাপের অপরাধী। পুলিশের কাছেও জাহালম একই কথা বলেন, ‘স্যার, আমি জাহালম। আবু সালেক না। আমি নির্দোষ।’ তবে তখন কেউ শোনেনি তার এই আকুতি। তার ঠাঁই হয় কারাগারে।

কারাগারে কেটে যায় আরও দুটি বছর। জাহালমকে যতবার আদালতে হাজির করা হয়, ততবারই তিনি বলেন, ‘আমি জাহালম। আমার বাবার নাম ইউসুফ আলী। মা মনোয়ারা বেগম। বাড়ি ধুবড়িয়া গ্রাম, সাকিন নাগরপুর ইউনিয়ন, জেলা টাঙ্গাইল। আমি আবু সালেক না।’

তার ভাই শাহানূর দিনের পর দিন আদালতের বারান্দায় ঘুরতে থাকেন। হাজতখানার পুলিশ থেকে শুরু করে আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাকে পান, তাকেই বলতে থাকেন, ‘আমার ভাই নির্দোষ।’ অথচ ব্যাংক, দুদক, পুলিশ ও আদালত-সবার কাছেই জাহালম হলেন ‘আবু সালেক’ নামের ধুরন্ধর ব্যাংক জালিয়াতিকারী।

image_pdfimage_print