Home ব্রেকিং সুলতান মনসুরের সংসদ সদস্য পদ থাকা নিয়ে আইনি বিতর্ক

সুলতান মনসুরের সংসদ সদস্য পদ থাকা নিয়ে আইনি বিতর্ক


বিশ্ববিদ্যায়ল পরিক্রমা ডেস্ক : গণফোরাম থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচিত হওয়ার পর দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নেয়ায় সুলতান মো: মনসুরের সংসদ সদস্য পদ থাকা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি শপথ নেন। ওই দিনই গণফোরাম থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। একই সাথে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য পদ থেকেও তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। সুলতান মো: মনসুরের সংসদ সদস্য পদ থাকা নিয়ে এখন আইন অঙ্গনে তোলপাড় চলছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে।’ এ অনুচ্ছেদে ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো সংসদ সদস্য যে দল তাহাকে নির্বাচনে প্রার্থীরূপে মনোনীত করিয়াছে, সে দলের নির্দেশ অমান্য করিয়া (ক) সংসদে উপস্থিত থাকিয়া ভোটদানে বিরত থাকেন, অথবা (খ) সংসদের কোনো বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দান করিয়াছেন বলে গণ্য হইবে।’

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো দল থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর সে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করলে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারাবেন। অতীতে এ রকম প্রশ্ন দেখা দিলে তারা শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্য পদ হারিয়েছেন। আওয়ামী লীগের দু’জন সংসদ সদস্য বিএনপিতে যোগদান করার পর তাদেরকে বিএনপি সরকার মন্ত্রী বানিয়েছিল। কিন্তু আইনি লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত তারা হেরে যান। তবে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সংবিধানের আলোচিত ফ্লোর ক্রসিং তখনই কার্যকর হবে যখন সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য শপথ নেবেন। এরপর সংসদে তিনি দলের বিপক্ষে ভোট প্রদান কিংবা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে সংসদ সদস্য পদ হারানোর প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু শপথ গ্রহণের কারণে তিনি সদস্য পদ হারাবেন না। কেউ শপথ গ্রহণ না করলে তার পদ হারানোর প্রশ্ন উঠবে না। ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের বক্তব্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি হতে আরো অপেক্ষা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সুলতান মো: মনসুরের আরো একটি সুবিধাজনক দিক রয়েছে যে, সংসদে তার দলের অন্য কোনো প্রতিনিধি এখনো শপথ নেননি। যেহেতু তাদের সংসদে কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই সে কারণে দলের বিপক্ষে ভোটদানেরও কোনো সুযোগ নেই।

আইন বিশেষজ্ঞদের আরেকটি মত হচ্ছে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে কেউ নির্বাচিত হওয়ার পর সেই দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করলে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারাবেন। আবার দল যদি তাকে বহিষ্কার করে তাহলেও তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে। সুলতান মো: মনসুর ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এখন তাকে মনোনয়ন প্রদানকারী দল বহিষ্কার করলে তিনি ওই দলের সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না। মূল দল তাকে বহিষ্কার করার কারণে আপনা-আপনি তার সংসদ সদস্য পদ চলে যাবে। স্পিকারকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হলে তিনি ব্যবস্থা নেবেন। সুলতান মো: মনসুর সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ইতোমধ্যে দলীয় আদেশ অমান্য করেছেন। দল তাকে বহিষ্কার করেছে, এখন এ পদে তার থাকার কোনো সুযোগ নেই।

অতীত ইতিহাস বলছে, আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগদানকারী ডা: আলাউদ্দিন ও স্বপন ফ্লোর ক্রসিং করলে বিষয়টি দীর্ঘ সময় নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকে। আইনি লড়াইয়ে তারা হেরে যান। কিন্তু ততক্ষণে সংসদের মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ইকতেদার আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের চেতনা অনুযায়ী কোনো দল থেকে নির্বাচিত হয়ে সে দলের নির্দেশ অমান্যের কোনো সুযোগ নেই। সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ এবং দল থেকে বহিষ্কার দুটিই সমার্থক। সুলতান মো: মনসুরের ক্ষেত্রে তার দল থেকে বহিষ্কারের পর সংসদ সদস্য হিসেবে থাকা বাঞ্ছনীয় নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল এ প্রসঙ্গে বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেউ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে। এ আইন অনুযায়ী সুলতান মো: মনসুর দলের বিপক্ষে ভোট দেননি। কিন্তু এখানে সংবিধানের মূল চেতনা কি সেটাও দেখতে হবে। সে অনুযায়ী উনি অবশ্যই দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদের ভেতরে দলের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। আইনে দলের বিপক্ষে ভোটদানের কথা বলা হয়েছে। ভোট অর্থ অবশ্যই দলের বিপক্ষে দাঁড়ানো। সুলতান মো: মনসুর সে কাজটিই করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে আইন সব সময় ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে প্রণীত হয়। সংবিধানের অনেক অনুচ্ছেদই এভাবে সংশোধন করা হয়েছে। সুলতান মো: মনসুরের ক্ষেত্রেও তেমন করা হলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। সূত্র: নয়া দিগন্ত