Home জাতীয় বিশ্ব গণমাধ্যমের মূল্যায়ন : ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সমার্থক বঙ্গবন্ধু

বিশ্ব গণমাধ্যমের মূল্যায়ন : ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সমার্থক বঙ্গবন্ধু

SHARE

বজলুর রায়হান
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলা ও বাঙালির ‘রাখাল রাজা’ খ্যাত বঙ্গবন্ধু এ জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল তথা সব ধরনের শোষণ বঞ্চনা থেকে মুক্তির জন্য আজীবন আপসহীন আন্দোলন-সংগ্রাম করে গেছেন। বাঙালি জাতির দরদী নেতা হিসেবে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তিনি ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল জনসভায় মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে উদাত্ত আহ্বান জানান। তাঁর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালি ছাত্র-যুবক, শ্রমিক-কৃষক মেহনতি জনতা ও নারী সমাজ ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার দৃপ্ত শপথে বলীয়ান হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এ দেশের নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ২৬ মার্চ শুরু হয় জনযুদ্ধ যা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বর হামলা ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের দোসর ছিল এদেশের কতিপয় ধর্মব্যবসায়ী ও দালাল; যারা বাংলার স্বাধীনতাকে মেনে নেয়নি। স্বাধীনতাবিরোধী কুচক্রী মহলের মদদে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর কতিপয় পথভ্রষ্ট সদস্য জাতির জনককে নির্মমভাবে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক ও স্বদেশের ক্ষমতালিপ্সুদের ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন। তাঁকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে ঘাতকেরা বাংলার স্বাধীনতাকে বিলীন করতে চেয়েছিল। কিন্তু কুচক্রীরা ক্ষমতায় স্থায়ী হতে পারেনি। বিচারের মধ্য দিয়ে তাদের সাজা পেতে হয়েছে। বাঙালির হৃদয়ের রাজা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অশ্রুসিক্ত নয়নে স্মরণ করে সব প্রজন্মের মানুষ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের জনগণ শ্রদ্ধাভরা চিত্তে স্মরণ করেন। অপরদিকে বিশ্ব গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন রেফারেন্স বইয়ে তিনি ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সমার্থক হিসাবে সমাদৃত।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এনসাইক্লোপিডিয়াগুলোর অন্যতম ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ডটকমে’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ক্যারিশম্যাটিক নেতা শেখ মুজিব তৃতীয় বিশ্বে উপনিবেশবিরোধী নেতৃত্বের প্রতিমূর্তিতে পরিণত হয়েছিলেন।’ এতে লেখা হয়েছে, ‘শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) ছিলেন একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা যিনি ভারতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠিত করেন, উপনিবেশ-উত্তর পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায় কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের নেতৃত্ব দেন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।’
এতে বলা হয়েছে, ‘শেখ মুজিবের জন্য শোষণ থেকে মুক্তির সংগ্রাম ছিল নিরন্তর। এ কারণে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভ করার পরও শোষণমুক্ত বাঙালি সমাজ গড়ার স্বপ্ন তাঁর অপূর্ণ থেকে যায়।’ এতে লেখা হয়েছে, ‘যখন তিনি স্বাধীনতা-উত্তর ইতিহাসের কঠিনতম সময় পার হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য লাভ করছিলেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছিল তখনই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবীন কিছুসংখ্যক জুনিয়র অফিসারের এক অপরিকল্পিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়।’
নিউজউইক ম্যাগাজিনের ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল সংখ্যাটির প্রচ্ছদ বঙ্গবন্ধুর জন্য উৎসর্গ এবং এতে তাঁকে ‘স্বাধীনতার প্রতীক’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া এতে তাঁর ওপর ‘রাজনীতির কাব্যকার’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। নিবন্ধে বলা হয়, ‘কাঁচা-পাকা চুল, ঘন গোঁফ ও কালো চোখের অধিকারী দীর্ঘদেহী বাঙালি মুজিব (৫ ফুট ১১ ইঞ্চি) তাঁর সভায় লাখ লাখ লোকের সমাবেশ ঘটাতে পারতেন এবং আবেগঘন বক্তৃতার মাধ্যমে তাদের মনমুগ্ধ করতেন। এ অঞ্চলের সকল শ্রেণি ও মতের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষমতা তাঁর ছিল।’
নিবন্ধে বলা হয়, শেখ মুজিব যখন মার্চের (১৯৭১) শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তখন তাঁর কতিপয় সমালোচক এ কথা প্রচার করে যে, তিনি উগ্র-সমর্থকদের দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছেন এবং সময়ের অপেক্ষায় আছেন। নিবন্ধে বলা হয়, নতুন বাঙালি জাতির সংগ্রামী নেতা হিসাবে মুজিবের আবির্ভাব মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্য তাঁর আজীবন সংগ্রামের অনিবার্য ফসল। এই প্রাপ্তি তাঁর জন্য মোটেও অপ্রত্যাশিত ছিল না।
টাইম ম্যাগাজিনের ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি সংখ্যায় ভারতীয় উপমহাদেশে বিগত অর্ধশতাব্দীতে যে সকল নেতা অনন্য সাধারণ প্রতিভায় ভাস্বর ছিলেন তাঁদের ইতিহাস তুলে ধরা হয়। তাঁরা হলেন- মহাত্মা গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও জওহর লাল নেহেরু। এতে বলা হয়েছে, ‘এখন এই তালিকায় আরো একটি নাম যুক্ত হতে যাচ্ছে- তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। এমনকি তাঁর নিন্দুকেরাও স্বীকার করেন যে, অত্যন্ত সফল জননেতা হওয়ার মতো গুণাবলী মুজিবের রয়েছে।’
ভারতের দি হিন্দুস্থান পত্রিকা লিখেছিল- ‘কোনো বিচারই তাঁকে বিশ্ব দরবারে হেয় করতে পারবে না। প্রকৃত সত্য হচ্ছে মুজিব একটি ঐতিহাসিক নামে পরিণত হয়েছে, যে নাম গণতন্ত্রের পরিপূরক এবং শোষণ-বঞ্চনার প্রতিবাদী কন্ঠস্বর।’
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিতে বাঙালি জাতির আনন্দ উৎসবে সেদিন বিশ্ব গণমাধ্যমও যোগ দেয়।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তাঁর ঐতিহাসিক মুক্তি প্রসঙ্গে ব্রিটেনের ‘দি গার্ডিয়ান’ পত্রিকা মন্তব্য করে- ‘মুজিবের ঢাকা বিমানবন্দরে পদার্পণের অর্থ হচ্ছেÑ নতুন প্রজাতন্ত্রটির প্রকৃত অস্তিত্ব লাভ করা।’
বজলুর রায়হান : কবি-সাংবাদিক