Home জাতীয় সিনহালা নববর্ষ ও বৈশাখের ভিত্তি বাঙালি সংস্কৃতি

সিনহালা নববর্ষ ও বৈশাখের ভিত্তি বাঙালি সংস্কৃতি

SHARE

করীম রেজা :

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন বৈশাখ মাসের এক তারিখ। বাংলাদেশ ছাড়া, অ-বাংলাভাষী কিছু জনসমাজও অনেককাল থেকে নববর্ষের প্রথম দিনরূপে তা পালন করে আসছেন। যেমন পাঞ্জাবি, তামিল, সিনহালি প্রভৃতি।
‘বৈশাখি’- পাঞ্জাবিদের অন্যতম জাতীয় উৎসব। পালিত হয় বাংলা পঞ্জিকা বর্ষ অনুসারে। সিনহালা জনগোষ্ঠীরও প্রধান উৎসবের দিন পহেলা বৈশাখ। ‘আওরদে পালামু দাওয়াসে’- সিনহালি ভাষায় নববর্ষের প্রথম দিন। উদযাপন করা হয় বাংলাদেশের চেয়ে আরও বেশি সমারোহে।
অধুনা বাংলা সংস্কৃতির অনেক উৎসব-পার্বণই সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নানারূপে বিবর্তিত ও পরিবর্তিত হয়েছে। কখনও অজ্ঞানতা ও অকারণ অবহেলায় তা পরিত্যক্ত ও পরিত্যাজ্য হয়েছে।
সংস্কৃতি লালন-পালন, সাধন-পোষণ ও চর্চার দ্বারা জাতির ক্রমবিকাশের ধারা সভ্যতার নানা পর্যায়ে বিশেষ অবস্থানে চিহ্নিত, নির্ণিত ও আলোচিত-বিবেচিত হয়।
বৈশাখে নববর্ষের প্রথম দিন বাংলাদেশ ও বাঙালির আপন গৌরব ও ঐতিহ্যকে বিশেষরূপে প্রতিফলিত করে। বছরের প্রথম দিনের আনন্দ, আবেগ, উত্তেজনা সাধারণ জন-জীবনের খুব গভীরতম স্তর পর্যায়ে বিন্যস্ত। সকল শ্রেণী ও সমাজ-মানসে প্রথম বৈশাখ দিনের প্রভাব সমভাবের আলোড়ন ও উদ্দীপনা সৃজক; বাংলার মাটি ও মানুষের, ফসল বা প্রকৃতির নানা বৈভব ও রূপময়তার অকৃত্রিম বহিঃপ্রকাশ হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
বাংলা নববর্ষ নবান্নের উৎসব আমেজ ছড়িয়ে, বৈশাখের রুদ্ররূপ ছাপিয়ে, জন-জীবনের সর্ববৃহৎ, অন্যতম গণমুখী আয়োজন। বাঙালির ঐতিহ্যের শিকড়ে প্রোথিত ও গ্রথিত বাংলা নববর্ষের গুরুত্ব এক কথায় অনন্য ও মৃন্ময় চেতনায় ভাস্বর।
বর্তমানে কম্পিউটার, ইন্টারনেট প্রভৃতির আধুনিক প্রয়োগ ও ব্যাপক উপযোগিতা সত্ত্বেও দেশের ব্যবসায়ী সমাজে বিশেষভাবে বৈশাখের শুভ হালখাতা অনুষ্ঠিত হয় অত্যন্ত সাড়ম্বরে। ব্যর্থ, জীর্ণ, পুরাতনের পরিবর্তে প্রতিশ্র“তিশীল নতুনের আবাহন, আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ও প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় এইদিনে।
ডিসেম্বরের থার্টি ফার্স্টের মধ্যরাতের উচ্ছলতা উন্মাদনার চেয়ে অনেক বেশি শ্রী-সমৃদ্ধ পহেলা বৈশাখের রমনার সবুজ বটমূলের প্রকৃতি-সান্নিধ্যে গীত বৈশাখের আবাহন গান। অনেক বেশি হৃদয় আকুতি ধারণ করে চারুকলার ছাত্রশিক্ষকের মঙ্গল শোভাযাত্রা। এছাড়াও গ্রামে-গঞ্জে, শহর ও শহরতলীতে নানা লৌকিক মেলার বিচিত্র আয়োজন ও ঐতিহ্যের ধারা বিনির্মাণে অপরিসীম গুরুত্বের দাবিদার।
বিশিষ্ট সভাসদ ও জোতিষ শাস্ত্রবিদ আমীর ফতেউল্ল¬াহ সিরাজী সম্রাট আকবরের নির্দেশে বিজ্ঞাননির্ভর একটি সৌর-সন বৎসর উদ্ভাবন করেন। হিজরি চান্দ্রসন ছিল তখনকার সরকারি কার্যে ব্যবহার্য। তাই বাংলার মৌসুমি পালা-পার্বণ, উৎসব-আচার পালনে ছিল অসামঞ্জস্য। ‘আকবরনামা’য় উল্লি¬খিত সিরাজী প্রবর্তিত এবং বর্তমানে প্রচলিত ‘বাংলা সন’ই এ সমস্যা সার্থকভাবে নিরসন করে। বাঙালির আবহমান ঐতিহ্য ও উৎসবের সমন্বয় সাধিত হয় এই ঐতিহাসিক ‘বাংলা সন’ প্রচলনের দ্বারা।
১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৯৯৩ হিজরি সনের (১০ বা ১১ মার্চ) আকবর বাংলা সনের হিসাব প্রয়োগ ও চালু করেন। কিন্তু কার্যকর করার আদেশ করেন ৯৬৩ হিজরি বা ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ হতে। কেননা ঐ সনেই তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন।
বাংলাদেশের মতোই শ্রীলঙ্কায়ও খুবই মর্যাদা, গুরুত্ব ও আচার-নিষ্ঠতার মাধ্যমে উদযাপিত হয় বৈশাখের প্রথম দিনটি। সেখানে সর্বসাধারণের অবশ্য পালনীয় দিনটি সরকারি ছুটির দিন। সমুদ্রের টিপ সিংহল বা বর্তমান শ্রীলঙ্কা প্রাচীন শরনদ্বীপ বা সরনদ্বীপ। ভারতীয় ভূখণ্ডের সন্নিহিত দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান। ভারতের সাথে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক, সামাজিক, ভৌগোলিক, ধর্মীয় যোগাযোগ ও প্রভাব প্রবল বটে।
৫০৪ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ভারতের কোনো রাজ্যের, সম্ভবত পূর্ব বা উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের ‘প্রিন্স বিজয়’ নামের কোনো এক রাজন্য সপারিষদ শ্রীলঙ্কায় প্রথম পদার্পণ করেন। মহাবংশ পুরাণে তা উল্লে¬খ করা হয়েছে।
রামায়ণ অনুসারে বিষ্ণুর সপ্তম অবতার ‘রাম’ লঙ্কায় গিয়েছেন সীতাদেবীকে উদ্ধারের জন্য। রাক্ষস ইত্যাদির আবাসভূমি লঙ্কায়ই সীতা বন্দিনী ছিলেন।
প্রাপ্ত বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন সূত্রই ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যেকার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের প্রামাণিকতা প্রতিষ্ঠা করে। ‘প্রিন্স বিজয়’- নামটি বাংলা বলেই সাধারণভাবে অনুমিত হয়। তাছাড়া শ্রীলঙ্কার প্রাচীন ইতিহাসে বিজয় বাংলার কোনো দেশীয় রাজ্যের যুবরাজ বলেই বর্ণিত হয়েছেন। তদুপরি প্রচুর বাংলা শব্দ সিনহালা ভাষায় সামান্য উচ্চারণ বিভেদে সুপ্রাপ্য। যদিও কৃতঋণ শব্দের মূল উৎস বাংলা ও সিনহালা ভাষার একই- সংস্কৃত। সব মিলিয়ে প্রাচীন বাংলার সাথে সিংহল বা শ্রীলঙ্কার গভীর সম্পর্কসূত্র নির্ণয় সহজ।
আমরা জানি, ভারতীয় জীবন প্রবাহের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূলধারা প্রবাহ প্রধানত বাংলাকেন্দ্রিক ছিল। প্রাতঃস্মরণীয় একটি প্রবাদসম বাক্য এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য : ‘ডযধঃ ইবহমধষ ঃযরহশং ঃড়ফধু, ওহফরধ ঃযরহশং ঃড়সড়ৎৎড়’ি- যদিও এ বাক্যটির প্রয়োগ ও প্রচার আধুনিক এবং প্রিন্স বিজয়ের লঙ্কা গমনের পরবর্তীকালের, তবু এ থেকে প্রাচীনত্বের একটি সার্থক ভাব সহজে অনুমেয়। মনে রাখা দরকার, স্বল্প সময় পরিসরে কখনই কোনো প্রবাদ প্রতিষ্ঠা হয় না এবং হওয়া অসম্ভব কল্পনা।
শ্রীলঙ্কার ‘সিনহালি’ জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রচলিত ভারতীয় তথা বাংলাভাষী জনসমাজের ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব লক্ষণীয়। প্রাত্যহিক জীবনাচরণে ব্যবহৃত সাধারণ শব্দাবলী, আচার-উৎসব ইত্যাদি আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মে সহজেই তা পাওয়া যায়।
যেমন শ্রীলঙ্কার নববর্ষ ১৩ বা ১৪ এপ্রিল-এর অনুষ্ঠানে অবশ্য গীত একটি গানের প্রথম অংশ নিম্নরূপ ঃ
‘অলিন্দে তিবেন্নে কোই কোই দেসে?
অলিন্দে তিবেন্নে বাঙালি দেসে।’
বাংলা অর্থ :
অলিন্দে তিবেন্নে- কোথায় পাওয়া যায়? প্রথম চরণের এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় চরণে যে, অলিন্দে তিবেন্নে ‘বাঙালি দেসে’ বা বাঙালি (বাংলা) দেশে পাওয়া যায়। উক্ত বাঙালি দেসে অখণ্ড প্রাচীন বাংলাকেই নির্দেশ করে বলে নিঃসন্দেহে ধারণা করা যায়।
‘অলিন্দে তিবেন্নে’- এক ধরনের ঘন-রক্ত বর্ণের গোলাকার বীজ বিশেষ; বোঁটার দিকে ছোট্ট কালো একটি বিন্দু রয়েছে। বাংলাদেশের অঞ্চল বিশেষে এটি কুচ, কীচ, কেইজ বা রত্তি নামে পরিচিত। স্বর্ণকারের দোকানে এ লাল দানা রত্তি নিক্তিতে রেখে স্বর্ণের ওজন করতে দেখা গেছে নিকট অতীতে। হয়তো এখনও গ্রামাঞ্চলে ব্যবহৃত হয় বা হচ্ছে।
উক্ত গীতেরই অন্য আরেকটি অংশ :
‘গেনাথ সাদান্নে কোই কোই দেসে?
গেনাথ সাদান্নে সিনহলা দেসে’
অর্থাৎ ওই বীজ কোথায় রোপিত হয়? তা সিনহালা দেশে চাষ বা বপন করা হয়।
নারী-পুরুষ বয়স নির্বিশেষে নৃত্যের তালে তালে এই ছড়াগানটি সুর-তাল সহযোগে সমবেতভাবে গেয়ে থাকে সবাই বৈশাখের অবশ্য পালনীয় অনুষ্ঠানে। এটা তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সামাজিক বিধান, প্রাচীনকাল থেকে পুরুষানুক্রমে পালন করা হচ্ছে। ছোট্ট, সামান্য, ক্ষুদ্রকায় একটি বীজের প্রসঙ্গ নিয়ে যদি নববর্ষের অমন নির্দিষ্ট আচরণ অবশ্য পালনযোগ্য হয় তা থেকে সহজেই সিংহল বা শ্রীলঙ্কাবাসীদের দৈনন্দিন ও সামাজিক জীবনে বাংলা ও বাঙালি সমাজের প্রভাব কত গভীর ও ব্যাপক তা সম্যক ধারণা করা যায়।
শুভ ও অশুভকালের কর্মচেতনা সিনহালি সমাজে বিশেষ করে নববর্ষ উপলক্ষে খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে অনুসরণ করা হয়। কাল-তিথি মেনে সকল রকম দৈনন্দিন অবশ্য করণীয় কাজকর্ম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। বাংলা সনের পঞ্জিকার নির্দিষ্ট শুভকর্মের সময় অনুযায়ী কাজের সূচনা হয় সমগ্র শ্রীলঙ্কা জুড়ে।
খাবার রান্না ও গ্রহণ, আর্থিক লেনদেন- নতুন বছরের সব কাজই খুব নিয়ম ও নিষ্ঠার সাথে পালিত হতে দেখা যায়। কাগজের নোট ও ধাতব মুদ্রা পানপাতার উপর সযতেœ স্থাপন করে লেনদেনের শুভ আরম্ভ করা হয়। কাবাডি, কানামাছি প্রভৃতি খেলার নাম-সাদৃশ্য যেমন আছে, তেমনি খেলার নিয়ম-রীতিও প্রায় একই রকম। ব্যাপক ও দীর্ঘ গবেষণার দ্বারা বাংলা ও সিনহালি সম্প্রদায়ের যোগাযোগের মূলসূত্র উদ্ধার করা সম্ভব। প্রচলিত ইতিহাসে কেবল ‘রাজা বিজয়’ কেন্দ্রিক তথ্যই ভারতীয় তথা বাংলার যোগসূত্রের নির্দেশরূপে উক্ত। বাংলার প্রকৃত সম্পর্ক সূত্র ঐতিহাসিক বা গবেষকদের দৃষ্টির আড়ালে অনালোচিত রয়ে গেছে।
সিনহালি ভাষায় ‘ওয়েসাক’ হলো বাংলায় বৈশাখের রূপান্তর। ‘আসালা’- আষাঢ়ের, ‘বিনাড়ো’- ভাদ্রের এবং ‘উন্দুওয়াপ’- অগ্রহায়ণ। সিনহালি ভাষার বহু শব্দ ও বাক্য-গঠন-রীতির সাথে বাংলার অভিন্ন সাদৃশ্য রয়েছে।
বাংলাদেশে মূলত ফসল ঘরে তোলার মাস অঘ্রাণ বা অগ্রহায়ণই ছিল বছরের প্রথম মাস। হায়ণ বা বছরের অগ্র বা প্রথম মাস। সম্রাট আকবর কর্তৃক সংস্কারের পর বৈশাখ বছরের প্রথম মাসরূপে প্রচলিত হয়।
ফসল বোনা, ফসল কাটার দিনক্ষণ নির্ণয়, শুভ হালখাতা, প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, উৎসব অনুষ্ঠান, পালা-পার্বণ, বিবাহ, খাজনা প্রদান প্রভৃতি কাজকর্ম এখনও বাংলা সনের দিন তারিখ, তিথি-নক্ষত্র দ্বারাই নির্বিঘেœ শাসিত ও পরিচালিত।
আসমুদ্র হিমাচলের অদ্বিতীয় সম্রাটের প্রভাবে ও আদেশে সারা ভারত জুড়ে ‘বাংলা সন’ প্রচলিত ও আচরিত হয়েছে।
বর্তমানেও সুদূর শ্রীলঙ্কা, তামিলনাড়– ও পাঞ্জাবের বাংলা-সনের হিসাবানুসারে নববর্ষ পালন বিষয়টি বাংলার ব্যাপক প্রভাব-প্রমাণের অবশেষরূপে দৃষ্ট।
ইতিহাস ও প্রামাণিক গ্রন্থে উক্ত নব-উদ্ভাবিত সন ‘বাংলা সন’ নামেই লিপিবদ্ধ, প্রচলিত ও প্রচারিত হয়েছে এবং আজও হচ্ছে। বাংলাদেশ, বাঙালি হিসেবে অতীত ঐতিহ্যের ধারাবাহিক প্রচলন স্বতন্ত্র গৌরবের এবং এ গৌরব একান্তই বাঙালির, বাংলাদেশির।
করিম রেজা : কবি, শিক্ষাবিদ ও কলাম লেখক
karimreza9@gmail.com