Home জাতীয় ডেঙ্গু সামলানো একদল ‘সুপার হিরোর’ গল্প

ডেঙ্গু সামলানো একদল ‘সুপার হিরোর’ গল্প

3
0
SHARE

বিশ্ববিদ্যালয় পরিক্রমা ডেস্ক :  রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ইনডোর-আউটডোরে রোগীদের জন্য পা ফেলার জায়গা নেই। সব হাসপাতালে করা হয়েছে পৃথক ডেঙ্গু কর্নার। একেক বেডে তিন থেকে চারটি করে শিশু ডেঙ্গু রোগী। হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ড ছাড়িয়ে সার্জারি, শিশু, নারী-পুরুষ ওয়ার্ড, লিফটের পাশে, বাথরুমের সামনে, মেঝে, সিঁড়ির গোড়ায় ও লবিতে বসানো হয়েছে নতুন বেড। এমনকি সিসিইউ, আইসিইউতে পর্যন্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য।

গত কয়েকদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতাল, সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতাল, বেসরকারি গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্কয়ার হাসপাতাল, হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, কোনও কোনও হাসপাতালের আইসিইউ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের পর্যবেক্ষণের জন্য কেবিন বা ওয়ার্ডে নেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, সেখানেও ডেঙ্গু রোগীদের রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও চিকিৎসকরা নিজেদের চেম্বার ছেড়ে দিচ্ছেন রোগীদের জন্য। দিনরাত এক করে তারা চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেল্থ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য বলছে, রবিবার (৪ আগস্ট সকাল আটটা পর্যন্ত) দেশের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৮৭০ জন। এটাকে রেকর্ড সংখ্যক বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে, গত ১ আগস্ট ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ রোগী ভর্তি ছিল ১ হাজার ৭১২ জন।

কন্ট্রোল রুম জানায়, এ পর্যন্ত ঢাকার ৩৭টি সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাষিত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর সংখ্যা চার হাজার ৯৬৯ জন। ঢাকার বাইরে সারাদেশে ভর্তি হওয়া মোট রোগী দুই হাজার ৪২৯ জন। গত জানুয়ারি থেকে আজ ৪ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা ২৪ হাজার ৮০৪ জন, চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১৭ হাজার ৩৩৮ জন। দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে ভর্তি থাকা মোট রোগীর সংখ্যা সাত হাজার ৩৯৮ জন।

এত রোগীকে কী করে চিকিৎসা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই। হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সে হারে চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের সংখ্যা বেড়েছে কিনা, সেই প্রশ্ন তুলে তারা বলছেন, অতিরিক্ত রোগীর চাপে প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্সসহ সবাইকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারা কাজ করছেন সুপারহিরোদের মতো, কেউ কেউ তাদের ‘আনসিন হিরো’ বলেও ডাকছেন।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে রাতের বেলায় মেডিক্যাল অফিসার থাকেন মাত্র দুইজন। আর তাদের এ সময় রোগী সামলাতে হয় অন্তত দুইশ’ জনকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, রাতে যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসেন, তারা মহাখালী বাস টার্মিনালে নেমেই চলে আসেন এই কুর্মিটোলা হাসপাতালে। আর এখন ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য ২৪ ঘণ্টা পরীক্ষার সুযোগ থাকায় রাতের বেলায় অনেকে চলে আসেন। কোনও কোনও রাতে প্রায় ২০০ রোগীকেও সেবা দিতে হয়েছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পর যে হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বেশি, তার একটি ‘ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতাল’। এই হাসপাতালে কর্মরত আছেন তানভীর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘মে মাস থেকেই ডেঙ্গু জ্বরের রোগী পাচ্ছিলাম। কিন্তু যতই সময় গিয়েছে রোগীর সংখ্যা ততই বেড়েছে। এখন ডেঙ্গু জ্বরের রোগীদের ভিড়ে নিঃশ্বাস ফেলা দায়। আমাদের মতো গরিব দেশে চিকিৎসকের ক্লিনিক্যাল দক্ষতার ওপর ভরসার বিকল্প নেই। কিন্তু এখন আর রোগীর প্রচণ্ড চাপে কোনোভাবেই কাউন্সেলিং করার সুযোগ বা সময় কোনোটাই পাওয়া যাচ্ছে না। লাইন ধরে জ্বরের রোগী দেখতে হচ্ছে, সবাই অস্থির আর আতঙ্কিত। রোগীদের ভর্তি দেওয়ার জন্য সিট পাওয়া যাচ্ছে না।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন হাসপাতালের হেমোটলজি স্পেশালিস্ট অ্যান্ড কনসালটেন্ট ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালগুলোর ইমার্জেন্সি বিভাগগুলো ডেঙ্গু রোগীর চাপে আছে।’ অন্য কাজ করবে কখন প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘ডাবল-ট্রিপল শিফটে ডিউটি করছেন চিকিৎসকরা। রোগীর চাপ আছে। ঢাকায় প্রবল চিকিৎসক ও নার্স সংকট চলছে। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালে। অথচ মিনিটে মিনিটে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী আসছেন।’

এই চিকিৎসক বলেন, ‘আতঙ্কিত হবেন না বলে লাভ হবে না। রোগীরা সরাসরি ডাক্তারকেই দেখাতে চায়। খুব কম রোগীই শকে যাচ্ছে। তারচেয়েও কম মারা যাচ্ছে। কিন্তু যাচ্ছে তো। তাই মানুষের মনে ভয় ঢুকছে।’ এজন্য ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে অস্থায়ী ক্যাম্প করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘অস্থায়ী ভিত্তিতে ডাক্তার নিয়োগ দিন। ডাক্তার অন্তত রিপোর্ট দেখে রোগীকে পরামর্শ দিক—কে ভর্তি হবেন, কে হবেন না। ভর্তি না হলে করণীয় কী, তা বলুক। ইমারজেন্সিগুলোতে কন্ট্রাকচুয়াল নিয়োগ দিন। অনেক বেকার ডাক্তার আছেন। তারা কিছু কাজ করুক। অস্থায়ী ভিত্তিতে নার্স নিয়োগ দিন।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স কানিজ ফাতেমা বলেন, ‘চাকরি জীবনে এ রকম রোগীর চাপ দেখিনি। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা।। চিকিৎসক-নার্সসহ হাসপাতালের তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা সবাই অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। নয়তো এ চাপ সামলানো সম্ভব হতো না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সিনিয়র স্টাফ নার্স জানান, গত ২২ বছর ধরে তিনি এ হাসপাতালে কর্মরত আছেন। গতকাল (৩ আগস্ট) ঢাকার বক্ষব্যাধী হাসপাতাল, ক্যান্সার হাসপাতাল ও মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতাল থেকে ১০০ নার্সকে সংযুক্ত করা হয়েছে। এরফলে আরও বেশি রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এখন সবাই মিলে এ চাপটা ভাগ করে নেওয়া যাবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মতলেবুর রহমান বলেন, ‘মশা বেশি থাকার কারণেই এবারে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। আর সব চিকিৎসকের ছুটি বাতিল হয়েছে। জুনিয়র, মিড লেভেল ও সিনিয়র—সবাই অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। আমাদের যে ক্যাপাসিটি, তার চেয়ে অন্তত দশগুণ বেশি সার্ভিস দিচ্ছি আমরা। এটা যেহেতু একটি জাতীয় দুর্যোগ, তাই নিজেদের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই এ কজ করছি।’

নতুন করে কোনও ফোর্স বাড়েনি মন্তব্য করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার ডা. ইয়াসমিন আক্তার বলেন, ‘আমাদের যত রোগী থাকার কথা তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী হাসপাতালে। অথচ ফিমেল মেডিসিন বিভাগের নয় নম্বর ইউনিটেই কেবল রোগী রয়েছেন প্রায় তিন শ’। একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোতে কিন্তু অন্য রোগীও রয়েছে। তাদেরও দেখতে হয়। রোগীর সংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসক নেই। তাই সবটাই দেখতে হচ্ছে আমাদের।’

জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘একেবারে ইন্টার্ন থেকে শুরু করে প্রত্যেক চিকিৎসক অক্লান্ত পরিশ্রম করছে দিনরাত। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল আড়াই হাজার রোগীর জন্য তৈরি এবং জনবল দেওয়া আছে এই আড়াই হাজারের জন্য। কিন্তু সেখানে গতকাল (৩ আগস্ট) ছিল চার হাজার ছয়শ রোগী। আমাদের ডক্টররা, দে আর ডক্টর। দে লাভ দেয়ার প্রফেশন।’

অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমার কোনও চিকিৎসক বলেননি, আমরা যে এই তিন-চারগুণ রোগী নিয়ে কাজ করছি, এর জন্য কোনও এক্সট্রা বেনিফিট দিতে হবে। বিকজ দে লাভ দেয়ার সার্ভিস, দে লাভ দেয়ার প্রফেশন। অনুপাত যাই হোক, আমাদের বললে চলবে না যে, আমরা ক্লান্ত, আমরা কাজ করবো না। কারণ, উই হ্যাভ টু ওয়ার্ক।’

এদিকে, চিকিৎসকদের সেবায় রোগীরা সন্তুষ্ট। ‘ডাক্তার সম্পর্কে তাদের ধারণা বদলে গেছে। এ প্রসঙ্গে ঢামেক হাসপাতালেরই ডেঙ্গু রোগী আতিয়া বলেন, ‘আমি ভাবিনি বাঁচবো।’ কিন্তু চিকিৎসদের সেবায় বেঁচে আছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

image_pdfimage_print