Home করোনা কোভিট-১৯ সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি এবং চিকিৎসায় সাজেদা হাসপাতাল, নারায়ণগঞ্জ

কোভিট-১৯ সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি এবং চিকিৎসায় সাজেদা হাসপাতাল, নারায়ণগঞ্জ

SHARE

ড.হাবিবুর রহমান খান : করোনাভাইরাস বা কোভিট-১৯ আক্রমণে ফুসফুসে মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করে।এই রোগের প্রধান উপসর্গ –শুস্ক কাশি ও জ্বর, শরীর ব্যথা,গলা ব্যথা ও খুশখুশ,মাথা ব্যথা,কখনো পেট খারাপ। সাধারণত শুস্ক কাশি ও জ্বরের মাধ্যমেই শুরু হয় উপসর্গ। ভাইরাসটির ‘ইনকিউবেশন পিরিয়ড’ ১৪ দিন।এটি এতো বড় পরিসরে প্রদাহ তৈরি করে যে,রোগীর পুরো শরীর ভেঙ্গে পড়ে এবং এক সঙ্গে একাধিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যায়।

 

করোনাভাইরাসের উৎপত্তি চীনের উহান শহরে হলেও চীন মাত্র ২ মাসে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে। চীনে এখন পর্যন্ত মারা গেছে হাজার পাঁচেক মানুষ। করোনা সংক্রমণের প্রথম দিকে ইতালি,স্পেন,যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ইরানের অবস্থা খুব খারাপের দিকে গেলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশটি করোনা ভাইরাসে সংক্রমণ এবং মৃত্যু উভয় বিবেচনায় ১ নম্বরে রয়েছে।

 

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ৮ মার্চ’২০ তারিখ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়। দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই হটস্পট হিসেবে বিবেচিত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলা। পরে যুক্ত হয় চট্টগ্রামের নামও।করোনায় ষাটোর্ধরাই বেশী মারা যাচ্ছেন। তাছাড়া  মৃত্যুর হারে ৬০ শতাংশই পুরুষ। কোভিট-১৯ মোকাবিলায় নারী ও পুরুষ পৃথক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরী করে বিধায় পুরুষরা আক্রান্ত হয় বেশী এবং মৃত্যুর হারও বেশী। নারী আক্রান্তরা সাদা রক্ত কণিকার মতো টি-লিম্পোসাইটসের মাধ্যমে জোরালো প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরী করতে পারে।অন্য দিকে বয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে টি-সেল অ্যাক্টিভিটি কম বলে তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাও দূর্বল।

 

করোনাভাইরাস দ্রুতই নিজের মধ্যে পরিবর্তন করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে করোনাভাইরাসের রূপ পরিবর্তনের হার ৭.২৩ শতাংশ কিন্তু বাংলাদেশে এই হার ১২.৬০ শতাংশ। গবেষকরা বলছেন, করোনাভাইরাসে মোট ২৮টি প্রোটিন থাকে।এর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘স্পাইক’ প্রোটিন এবং এই প্রোটিন দিয়েই সে আক্রমণ করে। সারা বিশ্বে ৬ ধরনের করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার মার্ক ওয়ালপোর্ট বলেছেন, কোভিট-১৯ কোন না-কোন আদলে আমাদের সাথে আজীবন থেকে যেতে পারে।

 

বিশ্বে কোভিট-১৯ শনাক্ত হওয়ার ৩ মাস পর ৮ মার্চ’২০ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়।দীর্ঘ সময় পাওয়ার পরও দেশের প্রশাসন ছিল নির্লিপ্ত। তার মাসুলও জনগন দিয়ে চলেছে।কিন্তু এ ভাবেতো চলতে পারে না।চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেকেন্ড ওয়েভের (দ্বিতীয় দফা) করোনাভাইরাস আরো বেশী শক্তিশালী হবে।করোনাভাইরাস যাতে দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে সেজন্য নিজের মধ্যে পরিবর্তন করে নিয়েছে। ভাইরাসের মুকুটসদৃশ স্পাইকের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটেছে। পরিবর্তিত ভাইরাসের মধ্যে যে স্পাইকগুলো রয়েছে সেগুলোর আক্রমণ এবং মানুষের শরীরের কোষকে ধরে রাখার ক্ষমতা বেশী। প্রতিনিয়ত চরিত্র বদলানোর কারণে ভাইরাসটি বেশ শক্তিশালী। স্পাইক প্রোটিনকে ঢেকে রেখেছে শর্করা জাতীয় অনু ‘গ্লাইক্যান’ নামক ‘বর্মবস্ত্র’।বর্মবস্ত্রটি স্পাইক প্রোটিনের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয় না কোন অ্যান্টিনডিকে।ফলে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা একটু কঠিন হয়ে যায়।তবে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, তারা অন্ততঃ ৩০টি ভ্যাকসিন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন এবং চলতি বছরেই বাজারে ভ্যাকসিন এসে যাবে মর্মে তারা আশাবাদী।

 

করোনাভাইরাস যে চরিত্র প্রদর্শন করছে তাতে আপাততঃ এটা বলা যায় ভাইরাসটি কখনোই নির্মূল হবে না।ভ্যাকসিন আবিস্কার হলেও সুস্থ থাকার জন্য মানুষকে নির্দিষ্ট সময় পরপর ভ্যাকসিনটি গ্রহণ করতে হবে।

 

এ দিকে আগষ্ট’২০ মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অন-লাইন ব্রিফিংয়ে জানা যায় বিশ্বজুড়ে তরুণ করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আক্রান্তদের অনেকেই জানেন না যে তারা করোনায় আক্রান্ত। অক্টোবর’২০ মাসের প্রথম সপ্তাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মাইক রায়ান বলেছেন, আমরা কঠিন এক সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বের প্রতি ১০ জনে ১ জন কোভিট-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরো বলছে, সংক্রামক রোগের মধ্যে ভয়াবহতার শীর্ষে রয়েছে কোভিট-১৯। এটি ক্রমেই জটিল ও ধূর্ত হয়ে উঠছে।পুরোপুরি কার্যকর ভ্যাকসিন আসার আগে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারীতে ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

 

 

ইউরোপসহ পৃথিবীর অনেক দেশে শীত পড়া শুরু হয়েছে। ঐ সব দেশে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে করোনার ‘সেকেন্ড ওয়েভ ‘ বা দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ। ফলে কোন কোন দেশ নতুন করে পুরো লকডাউন করে দেওয়ার কথা ভাবছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, বাংলাদেশে ইতিমধ্যে করোনার ‘সেকেন্ড ওয়েভ ‘ শুরু হয়েছে, যা মোকাবিলায় সরকার পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

 

বাংলাদেশে করোনায় এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। কোভিট-১৯ পজিটিভ রোগী সুস্থ হয়ে উঠলেও তার দেহে পরবর্তী ৩ মাস ভাইরাসটি থাকতে পারে।তবে সে ভাইরাস দূর্বল হওয়ার কারণে অন্য কারো দেহে সংক্রমিত হচ্ছে না।আশার কথা হলো, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় বার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না। বাংলাদেশে করোনা শনাক্তের ৬৭.২২% সুস্থ এবং ১.৩৭% মৃত।তবে কেউ কেউ মনে করছেন, আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের ৪ গুন।সম্প্রতি আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবি’র এক যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে রাজধানী ঢাকার ৪৫% মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের ২৪% এর বয়স ৬০ বছরের বেশী। বস্তিবাসীর প্রায় তিন চতুর্থাংশ মানুষ এরই মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। গবেষণায় আরো বলা হয়েছে (দৈনিক নয়া দিগন্ত-১৪ অক্টোবর’২০) রাজধানী ঢাকার ৪৫% এবং বস্তিবাসী ৭৪% মানুষের দেহে ২ ধরনের অ্যান্টিবডি গড়ে উঠেছে।মানব দেহে করোনাভাইরাস আক্রমণ করলে অ্যান্টিবডি ২টি ওগুলোকে আক্রমন করে অকার্যকর কিংবা নিরপেক্ষ করে দেয়।তবে গবেষণাটি নিয়ে ইতিমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে (দৈনিক নয়া দিগন্ত-১৫ অক্টোবর’২০)।

 

 

করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচার প্রাথমিক উপায় :

 

(১) করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ফেস-মাস্ক ব্যবহার কাঁচা (ক্রড) ভ্যাকসিনের মতোই কাজ করে বলে বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন। ক্যালিফোর্ণিয়া ইউনিভার্সিটির জার্ণালে বলা হয়েছে, মাস্কের মাধ্যমে অন্যের দেহে স্বল্প পরিমাণ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে এক ধরনের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। তাছাড়া নিয়মিত হাত ধোয়া,পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা,সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, অপ্রয়োজনে বাহিরে না যাওয়া ইত্যাদিতো মানতেই হবে।

(২) ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গেলে ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়িয়ে তাতে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়াতে হবে। এতদ বিষয়ে নিম্নোক্ত ব্যয়ামটি বেশ কার্যকর।

(ক) ২ হাত সোজা করে পদ্মাসনে বসুন।

(খ) মেরুদন্ড সোজা রাখুন।

(গ) নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে ছাড়ুন।

(ঘ) এক নাক বন্ধ করে অন্য নাকে শ্বাস টানুন এবং বন্ধ  নাকে ছাড়ুন।

(ঙ) প্রক্রিয়াটি উল্টো ভাবেও করুন।

এটা দিনে অন্তত ২বার করুন। ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হবে না।পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না।

 

 

শিশু কিশোরের উপর করোনার প্রভাব : করোনার এই মহামারিতে সারা দেশেই শিশু কিশোররা মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। তারা যা করতে চায় তা করতে না পারাটা তাদের মানসিক যন্ত্রণার অন্যতম কারণ। সংক্রমণের ভয়ে দেশের অনেক শিশুকে সাধারণ অসুখেও সঠিক সময়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয় না।অনেক শিশু জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় টিকাও পাচ্ছে না। ফলে করোনা উত্তরকালে শিশুরা একটি বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। করোনা আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে পৃথক ইউনিট না থাকায় অভিভাবকরা সব সময় একটি আতঙ্কের মধ্যে থাকেন।অন্যদিকে আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত সুস্থ করতে বেশী মাত্রায় অসুধ দিচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।আক্রান্ত অনেক শিশুর ডায়রিয়া হতে দেখা যায়।এমতাবস্থায় শিশুকে সঠিক ভাবে তৈরী খাবার সেলাইন সঠিক নিয়মে খাওয়াতে হবে।অন্যথায় শিশুর ব্রেইনস্ট্রোকসহ অন্যান্য মারাত্মক ব্যধির আশংকা রয়েছে।

 

শিশু কিশোরদের এখন অবসর সময় পার করতে হচ্ছে। এই অবসর সময়ে তারা অনলাইন গেম,মোবাইল, ডিজিটাল ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়ছে। মোবাইল আসক্তি বিনাশ করছে শিশুর মেধাশক্তি। যন্ত্রটি সিগারেটের চেয়ে হাজার গুনে বেশী ক্ষতি করছে আমাদের শিশুদের।

 

করোনায় শিক্ষা ব্যবস্থার অপূরনীয় ক্ষতি : মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ফারুক বলেছেন, করোনা চলে গেলেও আমাদের পূর্বেকার শিক্ষাপঞ্জি কখনোই আর আগের অবস্থানে ফিরে যাবে না। আগামী বছরেও শিক্ষাপঞ্জি নড়বড়ে থাকবে। ইতিমধ্যে পিইসি,জেএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, করোনার দূর্যোগ আরো ২ বছর একই অবস্থায় থাকতে পারে।তাই শিক্ষকদের দূর শিক্ষণ আর অনলাইনে শিক্ষা দানে অভ্যস্থ হতে হবে।

 

বহুল আলোচিত অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচারে বেশ এগিয়ে। কিন্তু প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট ডিভাইস, বিদ্যুৎ বিভ্রাট,এবং ইন্টারনেটের উচ্চ মূল্যের কারণে শিক্ষার্থীদের মাত্র ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ অনলাইনের সুবিধা ভোগ করতে পারছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর অনলাইন বা দূর শিক্ষণে আগ্রহ নাই।আবার দেখা গেছে ডিজিটাল পদ্ধতির উপায় উপকরণ থাকলেও প্রযুক্তি জ্ঞানের ঘাটতির কারণে অনেক শিক্ষক পদ্ধতিটির সাথে তাল মেলাতে পারছেন না।কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পদ্ধতিটিতে খুড়িয়ে খুড়িয়ে এগুচ্ছেন।

 

গত ৮ মাসে করোনা দূর্যোগের বিরূপ প্রভাব পড়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়।খুদে শিক্ষার্থীদের মনে করোনা ভীতি প্রকট।তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললে এদের প্রতি করতে হবে মানবিক আচরণ। একটি গবেষনায় দেখা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়েছে। তাদের পড়াশোনার সময় কমেছে ৮০ শতাংশ। পড়াশোনায় এই অমনোযোগিতার কারণে আগামীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেও বড় সংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়তে পারে। করোনার এই মহামারীতে উচ্চশিক্ষা পর্যায়েও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে।বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি সংখ্যা গড়ে ৫০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

 

করোনার সময়ে পেশা হারিয়েছেন অনেক শিক্ষক। ১৭ মার্চ’২০ তারিখ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে।বর্তমানে দেশে ৬০ হাজারেরও বেশী কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিক্ষার্থী রয়েছে ১ কোটির মতো এবং শিক্ষক রয়েছেন ১১ লক্ষ। করোনার কারণে এরা সবাই বেকার হয়েছেন। আর বেকারত্ব দূরীকরণ এবং জীবন যাপনের খরচ যোগাতে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন অন্য কোন পেশা।শুধু শিক্ষকবৃন্দ নন্ প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরাও ধারদেনায় পড়ে এখন স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে চালু করেছেন বিবিধ ব্যবসায়িক কার্যক্রম।

 

করোনা চিকিৎসায় ‘সাজেদা হাসপাতাল,নারায়ণগঞ্জ’ : সেপ্টেম্বর’২০ মাসের প্রথম সপ্তাহে কোভিট-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়লে অনুজ এডভোকেট দীপু ও পুত্র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সিয়াম পারস্পারিক পরামর্শের মাধ্যমে আমাকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জস্থ (সিমরাইল,চিটাগাংরোড) সাজেদা হাসপাতালে গত ১০ সেপ্টেম্বর’২০ ভর্তি  করেন।সেখানে আমি গত ১৭ সেপ্টেম্বর’২০ পর্যন্ত ৪১২ নং কক্ষে অবস্থান করে সহযোগী  অধ্যাপক ডাঃ আসিফ মুজতবা’র সার্বিক তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধিন ছিলাম।হাসপাতালটিতে ডাঃ মুজতবার মতো মোট ৩০ জন ডাক্তার, মিসেস রেশমার মতো ৫০ জন স্টাফ নার্স এবং ৭০ জন সেবাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিরলসভাবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগিদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

 

উক্ত হাসপাতালের সংক্ষিপ্ত  ৮ দিনের চিকিৎসা গ্রহণরত অবস্থায় যে সেবাশুশ্রূষা আমি পেয়েছি তা অতুলনীয় এবং নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ১০ তারিখ হাসপাতাল গেটে নেওয়া হলে নিয়ম মোতাবেক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করে নেওয়া হয়।এরপর থেকে পরিবার-পরিজনসহ বাকী দুনিয়া থেকে  আমি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি।আমার দেখভালের সার্বিক দায়িত্ব চলে যায় নিবেদিত প্রাণ ডাঃ মুজতবার মতো ডাক্তারবৃন্দ ও মিসেস রেশমার মতো দায়িত্বশীল নার্সবৃন্দের নিকট। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেখানে আমার মতো সকল কোভিট-১৯ পজিটিভ রোগীর চিকিৎসা শতভাগ বিনা মূল্যে চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, রোগীদের বিনা মূল্যে ৩ বেলা খাবারও পরিবেশন করা হচ্ছে নিয়মিত। সকালে রুটি/খিচুড়ী সাথে ডিম/হালুয়া/সবজি,দুপুর ও রাতে ভাত সাথে মাছ/গোস্ত,ডাল ও সবজি।পরিমাণ প্রয়োজনের চাইতে বেশী। ফলে অন্তত আমার বেলায় কিছু খাবারের অপচয় হয়েছে সবসময়। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নিবেন আশা করি।

 

১৬ সেপ্টেম্বর’২০ রাতে ডাঃ মুজতবা আমাকে জানালেন,আপনার নেগেটিভ রিপোর্ট এসে গেছে। আর এক মূহুর্ত নয়,আপনাকে আগামীকাল দুপুরে রিলিজ করে দেওয়া হবে। যথারীতি পরের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর’২০ আমাকে বিদায় করার সময় পরবর্তী ১৪ দিন আমাকে কি কি অষুধ খেতে হবে এবং কি ভাবে জীবন যাপন করতে হবে তার একটি ফর্দ হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো।যা এক কথায় অসাধারণ। পরিপূর্ণ সুস্থতা লাভের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং অনুজ দীপু ও পুত্র সিয়ামের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে আছে। একটি উত্তম হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পেরে আমি উৎফুল্ল।

বাংলাদেশে সামাজিক ভাবে দায়বদ্ধ সম্পূর্ণ অলাভজনক সেবামূলক একটি প্রতিষ্ঠান হলো ‘সাজেদা ফাউন্ডেশন’।  চিকিৎসা সেবা প্রদান এই প্রতিষ্ঠানের বহুবিধ জনসেবা মূলক কর্মকান্ডের মধ্যে অন্যতম।আপামর জনসাধারণের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী মিসেস জাহেদা ফিজ্জা কবীর নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জস্থ সিমরাইল (চিটাগংরোড) এলাকায় একটি এবং রাজধানী ঢাকার কেরানীগঞ্জে একটি মোট দু’টি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন।

 

সাজেদা হাসপাতাল,নারায়ণগঞ্জ প্রাথমিক ভাবে ৫০ সজ্জা বিশিষ্ট একটি সাধারণ হাসপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমানে এটি সম্পূর্ণরূপে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগিদের আইসোলেশন এবং চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।শুরুর দিকে এখানে গর্ভবতী সেবা,শিশু বিভাগ, মেডিসিন বিভাগ, চক্ষু বিভাগ, অর্থোপিডিক্স, সার্জারী, প্যাথলজি,এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফীসহ যাবতীয় চিকিৎসা সেবা দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সার্বিক তদারকির অধিনে অষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি রেনেটা’র সাথে পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তির আওতায় শুধু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগিদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। কোয়ারেন্টাইনের পাশাপাশি রোগীর সার্বিক সেবা,আইসোলেশন,ভেন্টিলেশন,ডায়ালাইসিস,আইসিইউ-সহ যাবতীয় সুযোগ এখানে প্রদান করা হয়।তাছাড়া ২৪ ঘন্টা অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসতো রয়েছেই।

 

৮ মার্চ’২০ বাংলাদেশে প্রথম যখন করোনাভাইরাস রোগী সনাক্ত হয় তখন প্রায় সকল ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান এই ধরনের রোগীর চিকিৎসায় অপারগতা বা অনিহা প্রকাশ করতে থাকে। ব্যতিক্রম শুধু সাজেদা হাসপাতাল,নারায়ণগঞ্জ। প্রতিষ্ঠানটি সংক্রমণ শুরুর প্রথম দিন থেকেই আক্রান্ত রোগিদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছে।তাও আবার শতভাগ বিনামূল্যে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত গাইড লাইন মোতাবেক করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগিদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে সাজেদা হাসপাতাল,নারায়ণগঞ্জ। হাসপাতালের প্রবেশ পথে নিরাপত্তা কর্মীরা দিচ্ছেন হ্যান্ড স্যানিটাইজার,দিচ্ছেন মাস্ক পরিধান এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার তাগিদ।প্রতিদিন এখানে প্রায় ১৫০ জন রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসে।গত সেপ্টেম্বর’২০ মাসে সর্বমোট ৬৫০জন কোভিট-১৯ পজিটিভ রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে হাসপাতালটিতে।

 

লেখক: বিশিষ্ট শিক্ষা ও জনসংযোগবিদ এবং

পরিচালক, জনতার.টিভি