Home ধর্ম ঐতিহ্যময় কোরবানির ইতিহাস

ঐতিহ্যময় কোরবানির ইতিহাস

SHARE

কালের ঘূর্ণিপাকে দিন, সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে প্রতিবছর আমাদের মাঝে এসে হাজির হয় ইসলামী শরিয়তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত কোরবানি। প্রতিবছরের মতো হিজরি বর্ষের জিলহজ মাসের প্রথমদিকেই আমাদের দ্বারপ্রান্তে আগমন করে কোরবানির দিনগুলো। সমগ্র মানবজাতির জন্য এই দিনগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রহমত বয়ে চলে কোরবানির দিবসজুড়ে। বরকত ছুঁয়ে যায় প্রতিটি শহরে। খোদার ইবাদতে পশুর রক্তে লাল হয় পৃথিবীর প্রাঙ্গণ। ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয় প্রতিটি হূদয়। মহান প্রভুর কাছে সঁপে দেয় আত্মত্যাগী প্রাণ। একমাত্র ইচ্ছা, মহান রবের নৈকট্য হাসিল। যেন ভাগ্যে জোটে সৌভাগ্যের মাকাম; জান্নাত।

কোরবানি ইসলামী শরিয়তে কোনো নতুন বিষয় নয়। কোরবানির ইতিবৃত্ত অকাট্য দলিলাদি দ্বারা প্রমাণিত। যা খুবই প্রাচীন ও পুরোনো। এর ফজিলত ও গুরুত্বও অপরিসীম। কোরবানির মাঝে লুকিয়ে আছে আত্মত্যাগের বিস্মৃত ইতিহাস। কোরবানির মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বান্দার সাথে তার মাওলার অফুরন্ত প্রেম। কোরবানিটা যেন এক আনন্দের ইতিহাস, আত্মত্যাগের ইতিহাস। সাইয়্যেদুনা ইবরাহিম (আ.)-এর সফলতা ও দুষ্ট শয়তানের বিফলতার চরম সত্য ইতিহাস। অবিস্মরণীয় এক আদিম ইতিহাস। আমরা যদি ইতিহাসের প্রচীন পাতায় হানা দিই, অবশ্যই পৃথিবীর প্রথম দিকের বিষয়গুলো দেখতে পাব। দেখতে পাব আমাদের আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর ইতিহাস। যার সাথে স্পষ্টভাবে মিশে আছে হাবিল-কাবিল। কোরবানির সূচনা এই হাবিল-কাবিল থেকেই। অপর দিকে রয়েছে আমাদের জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর আত্মত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্তের ইতিহাস। এতে জড়িয়ে আছে দুটো মহান ও বিস্তৃত ঘটনা।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে কোরবানির ইতিহাস ততটাই প্রাচীন যতটা প্রাচীন মানবজাতির ইতিহাস। আদি পিতা আদম আলাইহিস সালামের যুগ থেকেই কোরবানির বিধান চলে আসছে। মূলত আদম (আ.)-এর দুই ছেলে হাবিল ও কাবিলের বিবাহ নিয়ে সৃষ্ট মতভেদ দূর করার লক্ষ্যেই প্রথম কোরবানি করা হয়। যে ঘটনা মহাগ্রন্থ আল-কোরআনেও বর্ণিত হয়েছে।

কোরআনের ভাষায় আমরা জানতে পারি-
‘আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল, একজনের কোরবানি কবুল হলো, আর অন্যজনের কোরবানি কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো মুত্তাকিদের কোরবানিই কবুল করে থাকেন।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত-২৭)

পৃথিবীর সূচনালগ্নে যখন হজরত আদম ও হাওয়া (আ.) বিস্তৃত বসুধায় আগমন করেন এবং তাদের সন্তান-প্রজনন ও বংশ-বিস্তার শুরু হয়, তখন হাওয়া (আ.)-এর গর্ভ থেকে জময অর্থাৎ একসাথে একটি পুত্র ও একটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করত। কেবল শীশ (আ.)-এর বেলায়ই তার ব্যতিক্রম ঘটে। কেননা তিনি একাই ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। তখন ভাই-বোন ছাড়া পৃথিবীতে কোনো সন্তান ছিল না। অথচ ভাই-বোন পরস্পর বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ব্যাপারটা শুদ্ধ নয়। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আদম আলাইহিস সালামের শরিয়তে বিশেষভাবে নির্দেশ দিলেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম। কিন্তু পূর্বে জন্মগ্রহণকারী পুত্রের জন্য পরেরবারে জন্মগ্রহণকারী কন্যা সহোদরা বোন হিসেবে গণ্য হবে না। তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ হবে। সুতরাং সে সময় আদম (আ.) এক জোড়ার মেয়ের সাথে অন্য জোড়ার ছেলের বিয়ে দিতেন। ব্যাপারটা যদিও সহজ ছিল, কিন্তু ঘটনাক্রমে কাবিলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে ছিল খুব সুন্দরী। নাম ছিল আকলিমা। কিন্তু হাবিলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে দেখতে অতটা সুন্দরী ছিল না। তবুও আল্লাহর সৃষ্টি মানেই সুন্দর। ধীরে ধীরে বিবাহের সময় ঘনিয়ে আসলে শরিয়তের নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহোদরা কালো বোনটির বিবাহ হবে কাবিলের সাথে। এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না কাবিল। তখন আদম (আ.) শরিয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হলেন এবং তাকে আল্লাহর হুকুম মানতে বললেন। কিন্তু সে মানল না। অবাধ্যতার দিকে ছুটে যেতে লাগলো।

অবশেষে আদম (আ.) হাবিল ও কাবিলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা উভয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি পেশ করো, যার কোরবানি গৃহীত হবে, তার সাথেই আকলিমাকে বিয়ে দেওয়া হবে।’ সে সময় কোরবানি গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে যার কোরবানি কবুল করা হবে তার কোরবানিকে ভষ্মীভূত করে ফেলবে। আর তাঁদের দুভাইয়ের মধ্যে কাবিল ছিল চাষি। তাই সে গমের শীষ থেকে ভালো ভালো মালগুলো বের করে নিয়ে বাজে মালগুলোর একটা আটি কোরবানির জন্য পেশ করল। আর হাবিল ছিল পশুপালক। তাই সে তার জন্তুর মধ্যে থেকে সবচেয়ে সেরা একটি দুম্বা কোরবানির জন্য পেশ করল। এরপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবিলের কোরবানিটি ভষ্মীভূত করে দিল। আর কাবিলের কোরবানি অক্ষত অবস্থায় যথাস্থানেই পড়ে রইল। অর্থাৎ হাবিলের কোরবানিই গৃহীত হলো। কিন্তু কাবিল এবার আসমানি সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারল না। দুঃখ ও ক্ষোভ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। সে কিছুতেই মেনে নিতে রাজি নয়। অতঃপর প্রকাশ্যে তার ভাইকে বলেই ফেলল, ‘আমি তোমাকে হত্যা করব।’ হাবিল তখন ক্রোধের বদলে ক্রোধ প্রদর্শন করলো না। বরং সাবলীল মার্জিত ভাষায় মুখে হাসির ঝিটা নিয়ে বলল, ‘আল্লাহ তো মুত্তাকির কর্মই গ্রহণ করেন। সুতরাং তুমি তাকওয়াবান হও। তুমি যদি তাকওয়া অবলম্বন করতে, তাহলে তো অবশ্যই তোমার কোরবানিও গৃহীত হতো। কিন্তু তুমি তা করোনি, করেছো তার উল্টা। তাহলে কীভাবে কবুল হবে! অতএব এতে আমার দোষ কোথায়?’ (তথ্যসূত্র : তাফসিরে ইবনে কাসির ও ফাতহুল কাদির)

আমাদের ওপর যে কোরবানির বিধান এসেছে তা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর আত্মত্যাগের ঘটনারই স্মৃতিবহ। ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর রাহে যে কোরবানি করেছেন পৃথিবীর ইতিহাসে তা দৃষ্টান্তহীন। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগের কথা। এক রাতে স্বপ্নাদিষ্ট হলেন আল্লাহর প্রিয় খলিল হজরত ইবরাহিম (আ.) কোরবানি করতে। ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তিনি পশু কোরবানি করলেন। পরদিন আবার তিনি একই স্বপ্নে স্বপ্নাদিষ্ট হলেন। আবার তিনি কোরবানি করলেন একটির পর একটি পশু। কিন্তু সে কোরবানিও তাঁর প্রতিপালকের নিকট মনমতো হলো না। হজরত ইবরাহিম (আ.) বুঝতে পারলেন এমন বস্তু কোরবানি করতে যা স্বীয় কাছে সবচেয়ে প্রিয়। কী সেই প্রিয় জিনিস? তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু স্বীয় পুত্র ইসমাঈল ছাড়া কিছুই না। তবে কি তার মহান প্রভু ইবরাহিম ও মা হাজেরার পরম আদরের সন্তান ইসমাঈলকে শেষ করে দিতে চান? না, কখনোই হতে পারে না। আল্লাহর আদেশ ছিল অতি স্পষ্ট। সন্দেহেরও কোনো অবকাশ ছিল না। হজরত ইবরাহিম (আ.) এই আদেশ পেয়ে কিছুতেই বিভ্রান্ত হলেন না। একটু বিস্মৃতও হলেন না; বরং নির্দ্বিধায় হাসিমুখে হূদয়ের স্পন্দন কলিজার টুকরা প্রিয়পুত্র ইসমাঈলকে আল্লাহ হুকুম জানালেন, পুত্র ইসমাঈল প্রস্ফুট কণ্ঠে বাবার স্বপ্নের জবাবে বললেন, ‘হে আমার প্রিয়পিতা, আপনি যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়েছেন তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আপনি পালন করুন। ইনশাল্লাহ্ আপনি আমাকে ধর্যশীলদের কাতারে পাবেন।’ (সুরা সাফ্ফাত, আয়াত-১০২)

হজরত ইবরাহিম (আ.) ও প্রিয়পুত্র ইসমাঈল (আ.) উভয়েই আল্লাহর হুকুম পালনে দৃঢ় হলেন। মা হাজেরাও স্বেচ্ছায় নাঁড়িছেড়া ধন আদরের সন্তানকে সাজিয়ে দিলেন। শেষ গোসল দিয়ে দিলেন। অশ্রুসজল হাস্যোজ্জ্বল মুখে বিদায় দিয়ে জান্নাতের রাহে রওনা হতে বললেন। রওনা হলেন মরুভূমির পথ ধরে। প্রিয় বাবার হাতের আঙুল ধরে বাবার শরীরের ছায়াকে হাতছানি দিয়ে হাঁটছেন মনের আনন্দে ছোট্ট শিশু ইসমাঈল। না আছে মনে ব্যথা। না আছে বিরহ যাতনা। মুখে শুধু জান্নাতি হাসি। এপথ ধরে যেন ইসমাঈল জান্নাতের পথে হাঁটছে…সত্যি। যদিও বিশ্বাস করতে গেলে ভাবনার টনক নড়ে যায়। তবুও চিরসত্য মহাগ্রন্থের বর্ণনা। পিতা-মাতা ও পুত্রের এই কঠিন ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই প্রথম। নজিরহীন বিস্মৃত দৃষ্টান্ত। সত্যি! ভাবতেও অবাক লাগে। কীভাবে সম্ভব এটা। তবুও চিরসত্য। এটাই বাস্তব।

মরুভূমির আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে হাঁটছেন বাবা ও সন্তান। এ যেন এক মহান পরীক্ষার দিকে পা বাড়াচ্ছেন। যতোই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ততোই যেন পরীক্ষা কঠিন হতে চলছে। চলতে… চলতে পৌঁছে গেলেন মিনায় (বর্তমান হাজীদের কোরবানির স্থান)। এটাই ছিল তাদের গন্তব্যস্থল। জবেহের মাকাম।

হজরত ইবরাহিম আর দেরি করতে চাইলেন না। না জানি, শয়তান এসে আবার বাধার মুখে ফেলে দেয়! আদরের পুত্র ইসমাঈলকে উপুড় করিয়ে শুরু করে দিলেন ছুরি চালানো…ছুরি চালাচ্ছেন শক্তির ওপর ভর দিয়ে চালাচ্ছেন ধারালো অস্ত্র। কিন্তু ছুরি যেন চলছে না। বারবার চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। তবুও যেন সামনে এগুচ্ছেই না ছুরি। কে যেন টেনে ধরছে, ধারালো নাঙ্গা তলোয়ার! এ যেন খোদার মহান কুদরত। তাছাড়া কারইবা এতো ক্ষমতা। চলছে ঈমানি পরীক্ষা। চলছে খোদার প্রতি ভালোবাসার কঠিন পরীক্ষা। আত্মত্যাগ ও মহান মালিকের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে নবী ইবরাহিম (আ.) যখন প্রিয়পুত্র ইসমাঈলকে কোরবানি করতে গেলেন, সাথে সাথেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁদের পিতা-পুত্রের আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে কবুল করে নিলেন তাদের মনের কোরবানি। সফল ব্যক্তি বলে ঘোষণা দিলেন পবিত্র কোরআনে। আরো দিলেন তাদের আনুগত্য ও কর্তব্য পরায়ণতার পুরস্কারস্বরূপ মোটাতাজা জান্নাতি পশু (দুম্বা)। যেই দুম্মাটাই পুত্রের পরিবর্তে জবাই করার হুকুম প্রদান করলেন। সম্পূর্ণ হলো পিতা-মাতা ও পুত্রের ঈমানি পরীক্ষা ও পশুর করবানি।

তাই সে প্রাচীনতম সময় থেকেই ইবরাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর কোরবানি দেওয়ার এ অবিস্মরণীয় ঘটনাকে প্রাণবন্ত ও চিরস্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যেই উম্মতে মোহাম্মদির ওপর প্রত্যেক মুকিম, আকেল, বালেগ ও মৌলিক প্রয়োজন এবং ঋণ ব্যতীত নেছাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী মুসলমানের ওপর এই গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত কোরবানিকে ওয়াজিব করেছেন। সেই থেকে সারা বিশ্বে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উদযাপিত হয়ে আসছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে ঈদুল আজহা তথা কোরবানি এক ঐতিহ্যময় স্থান দখল করে ছিল। আছে। থাকবে ইনশাআল্লাহ।