Home জাতীয় জলবায়ু দুর্যোগে বছরে গৃহহীন ৫০ হাজার মানুষ

জলবায়ু দুর্যোগে বছরে গৃহহীন ৫০ হাজার মানুষ

SHARE

পৃথিবীতে দুর্যোগ প্রবণ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৬ষ্ট স্থানে। ভৌগলিক অবস্থার কারণে অন্যদেশের তুলনায় দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি। তবে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ‍বিশ্বে মডেল হলেও দেশে উদ্বাস্তু প্রায় ১ কোটি মানুষ। প্রতি বছরে গৃহহীন হচ্ছে ৫০ হাজার মানুষ।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতিদিন বাড়ছে উদ্বাস্তের সংখ্যা। তাদের বেশিরভাগ মানুষ চরাঞ্চলের। সমন্বিত উন্নয়নের ধারা অব্যহত রাখতে বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও তা বাস্তবায়নের কোনও কমিটি নেই; ফেরত যাচ্ছে সেই টাকাও। তাই সারাদেশের সঙ্গে চরাঞ্চলের শিক্ষার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, জীবিকাসহ অন্য সুবিধাগুলো বাড়াতে ‘চর উন্নয়ন বোর্ড’-এর তাগিদ দেন বক্তারা।

সোমবার (২৭ ডিসেম্বর) রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে জাতীয় ওয়ার্কশপে এসব কথা বলেন বক্তারা। অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলের পীড়িত মানুষ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের আয়োজনে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম মোহন।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ড. খলিকুজ্জামানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আতিকুল হক, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজেক্ট ডিরেক্টর (এলজিপি) ও যুগ্ম সচিব এনামুল হাবিব ও কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফিয়োনা মেকলাইসেট ও প্রাক্টিক্যাল অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর শওকত আরা বেগম।

কনর্সান ওর্য়াল্ডওয়াইড ও প্র্যাক্টিক্যাল অ্যাকশনের আয়োজনে কর্মশালায় ‘ফ্লুড রেজিলেন্স অ্যালায়েন্স’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সুবিনয় দত্ত। ফরিদপুর, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধার বিভিন্ন চরাঞ্চলের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব এলাকার অনেক স্থান এখন শুধু মানচিত্র বা ছবিতে রয়েছে। বন্যার আগে ৮০ টাকা ব্যবহার করলে বন্যাপরবর্তী তা ৮০০ টাকার উপকার মেলে।

তিনি বলেন, আমরা বন্যাপ্রবণ এলাকগুলো নিয়ে কাজ কেরে থাকি। লক্ষ্য বন্যাসহনশীলতা ও মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। বন্যার আগে ১ ডলার ব্যবহার করলে ৫ ডলার সেভ করা যায়। অন্যদিকে বন্যার সহনশীলতা রক্ষা করা গেলে এসডিজি অর্জনে সহায়ক হবে।

একই সঙ্গে বন্যার সময় চরাঞ্চলে ৩ তিনটি সমস্যা অর্থাৎ স্থানীয় সরকারের বাজেট ঘাটতি, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশিক্ষিত মানুষের অভাবের কথা তুলে ধরেন সুবিনয় দত্ত।

সভায় চর উন্নয়ন বোর্ডের প্রসঙ্গ তুলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল ইসলাম বলেন, বছরে ৫০ থেকে ৫৫ হাজার মানুষ গৃহহীন হচ্ছে। প্রতি বছরের বাড়ছে এই পরিমাণ। দেশের ২৩টি মন্ত্রণালয় এবং অনেক এনজিও এসব মানুষের উন্নয়নে কাজ করছে।

তবে আজকের বাংলাদেশে ইতিবাচক উন্নয়নের সহায়ক এনজিওগুলো। তারাই উন্নয়ন কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়েছে। তবে চর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে একমত। তাদের উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও বাস্তবায়ন কমিটি নেই। বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে, কমিটি আগামী বাজেটের আগে হবে বলে জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী শামসুল ইসলাম আরো বলে, নদী ভরাট বা প্রবাহ বন্ধ করা যাবে না। দেশে ৭০০টি বড় নদী রয়েছে, এজন্য নদী শাসন কমিশন হয়েছে। নদীর সীমানা নির্ধারণ ও চিহ্নিতকরণ চলছে। জলবায়ুর অভিঘাত প্রশমনসহ বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় ইতোমধ্যে সরকার ১০০ বছরের ডেল্টা প্ল্যান করেছে। যে কারণে ২০৪২ সালে আমাদের গত মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ১২০০ ডলার।

সভায় পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ড. খলিকুজ্জামান বলেন, আমাদের বড় সমস্যা ভৌগলিক অবস্থা। যে কারণে অন্য দেশের তুলনায় জলবায়ু ঝুঁকি বেশি। জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে এবং দ্রুত হচ্ছে। যে দেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব যত বেশি তাদের আঘাতের পরিমাপ বেশি।

তবে জলবায়ু ঝুঁকিতে কী পরিমাণ মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছে, তার সঠিক চিত্র এখনো আমাদের হাতে নেই। তাই এ বিষয়ে দ্রুত একটি গবেষণাপত্র তৈরি করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সভায় তৃণমূল পর্ায়ে বাজটে বরাদ্দ বাড়ানো এবং বন্যা সহনশীলতা উন্নয়নে কমিউনিটিকে সরাসরি সম্পৃক্ত করার কথা তুলে ধরা হয়। নদীনির্ভর এসব এলাকায় বন্যাসহনশীলতা কার্যক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার পরিবর্তন নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সম্পৃক্ততা তৈরির ধারাবাহিকতায় রক্ষায় এই কর্মশালার উদ্দেশ্য।
সভায় অংশগ্রহণ করেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মনজুরমহ আরো অনেকে। সভা থেকে তারা সারাদেশে সমন্বিত উন্নয়নের জন্য ‘চর উন্নয়ন বোর্ড’ গঠনের দাবি তোলেন।

দুজন জনপ্রতিনিধি বক্তব্যের সূত্র ধরে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আতিকুল হক বলেন, গাইবান্ধা জেলায় ১৪টি মুজিব কেল্লা পরিকল্পনায় আছে। অন্যদিকে বন্যার সময় বানভাসীদের উদ্ধারে বালাসী-১, বালাসী-২ এবং সুন্দরগঞ্জ-৩ নামে ৩টি নৌযান দেয়া হবে। তিনি বলেন, এসব যানে ৮৫ জন মানুষসহ বাড়িঘর, গরু বাছুর পরিবহণ করা যাবে।

কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফিয়োনা মেকলাইসেট বলেন, আমরা বিশ্বাস করি সরকার দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্নে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে তাদের সহনশীল ও টেকসই জীবন মানের উন্নয়নের বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে।

জাতীয় পর্যায়ে বন্যা সহনশীলতাবিষয়ক কর্মশালায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থায়ন বাড়ানো এবং বাস্তবায়ন কমিটি করতে সভা থেকে অনুরোধ জানান সুবিধাভোগীরা।