Home ক্যাম্পাস খবর শিক্ষকের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে

শিক্ষকের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে

SHARE

উন্নত জাতি ও সমাজ গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু দেশে সে শিক্ষকদের বৈধ অধিকার ও মর্যাদা আমরা কতটুকু রক্ষা করতে পারছি? একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে সত্যিকার মানুষ হওয়ার সন্ধান দিয়ে থাকেন। নীতি-নিষ্ঠা ও ন্যায়-অন্যায়ের বোধে উদ্বুদ্ধ করেন। ভালোর সান্নিধ্য গ্রহণ ও মন্দকে বর্জনের বুনিয়াদি শিক্ষা শিক্ষক দিয়ে থাকেন। তাই মনে করি, শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে শিক্ষক হবেন সেই জাতি গঠনের নির্মাতা। শ্রেণিকক্ষে ছাত্রদের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে দিতে মহান কার্য সম্পাদন করেন শিক্ষক। জ্ঞানরাজ্যে অবাধ বিচরণের প্রবেশদ্বার উন্মোচিত হয় শিক্ষকের হাত ধরেই। ফলে মর্যাদার দিক থেকে পৃথিবীতে মা-বাবার পরই শিক্ষকদের স্থান। মা-বাবা শিশুকে জন্ম দেন আর শিক্ষক তাকে মানুষরূপে গড়ে তোলেন। আজকের পৃথিবীতে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারাও কোনো শিক্ষকের ছাত্র। শিক্ষকরা সর্বদা মানুষ গড়ার কাজে ব্যস্ত থাকেন।

একটি শিশুর জন্য শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো তার পরিবার এবং শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হলেন শিশুর মা-বাবা। তারপরও প্রচলিত শিক্ষার দায়িত্ব যিনি পালন করেন, তাদেরই আমরা শিক্ষক বলি। শিশুর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকাশের জন্য আন্তরিকতার সঙ্গে যিনি শিক্ষাদান করেন, তিনিই হলেন শিশুর আদর্শ শিক্ষক। তাই শিক্ষাজীবন সমাপ্ত হলেও শিক্ষকের মর্যাদা ও অবদান ছাত্ররা ভুলবার কথা নয়। কিন্তু বর্তমান দৃশ্যপট বলছে ভিন্ন কথা। দেশে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের দ্বারা শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এমনকি তুচ্ছ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের দ্বারা শিক্ষক খুন হচ্ছে। সম্প্রতি সাভারের শিক্ষক উৎপল কুমারকে শিক্ষার্থী পিটিয়ে মারার ঘটনা সব বিবেকবান মানুষের অন্তরকে নাড়া দিয়েছে। ওই নির্মম ঘটনা শিক্ষকদের মাঝে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি দেশের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থাকে করছে বাধাগ্রস্ত, যা সত্যি চরম কষ্ট ও বেদনার কারণ বলে মনে করি। এই ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতির অবসানে শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা জরুরি।

যদিও আমাদের দেশের একজন শিক্ষক মূলত শিক্ষকতাকে মর্যাদাপূর্ণ পেশা বলে মনে করেন। ফলে অধিকাংশ শিক্ষক স্বল্প বেতনে নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেই এ পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন কেবলমাত্র মর্যাদা পাওয়ার আশায়। আর এই যৎসামান্য মর্যাদার বিপরীতে যখন একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীর হাতে লাঞ্ছিত বা খুন হতে হয় তখন নিজেকে এ জাতি হিসেবে প্রকাশ করতে লজ্জা বোধ করি। মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা তাহলে আগামী প্রজন্মকে কেমন শিক্ষায় শিক্ষিত করছি? এমন এক বাস্তবতায় সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে ইচ্ছা করে তারা কি পারছে শিক্ষকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সঠিক মর্যাদা দিতে। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি রোধ করতে, সমাজে শিষ্টাচার প্রতিষ্ঠা করতে, সর্বপ্রকার অবক্ষয় রোধ করতে, শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে? পাশাপাশি শিক্ষকরা কি পারছে শিক্ষার্থীদের কাছে একজন আদর্শবান ও আলোকিত মানুষ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে, ইত্যাদি। উল্লিখিত বিষয়গুলোর দিকে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।

যদিও অনেকেই মনে করেন, বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতির আমূল পরিবর্তন; পাঠ্যক্রমে নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষাকে গুরুত্ব কম দেওয়া, বেতন বৈষম্য, তথ্যপ্রযুক্তি অবাধ ব্যবহার; আকাশ-সংস্কৃতির প্রভাব, শ্রেণিকক্ষেক্ষশিক্ষক শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুসম্পর্কের ঘাটতি, শিক্ষকভীতি উঠে যাওয়াকেই বিশেষ কারণ বলে মনে করেন। তাই এই বিষয়গুলোর দিকে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

মূলত শিক্ষকরাই জাতি গড়ার কারিগর। শিক্ষকরা ছাত্রদের পথপ্রদর্শক। তাই তাদের উচিত শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করা। শিক্ষকদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ থাকাটাও জরুরি। জ্ঞান বিতরণের যে বিষয়টি, তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসা উচিত, এর সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। সব শিক্ষার্থীকে সমান চোখে দেখাটাও অধিক জরুরি। বর্তমান শিক্ষকদের অনেকেই সেবার মনোভাব ভুলে অর্থের পেছনে ছুটছেন। অনেকেই মনে করে থাকেন, তারা সব ধরনের জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে; তাদের এ মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একজন শিক্ষককে অবশ্যই মানবিক গুণাবলির অধিকারী হতে হয়। সততা, কর্মনিষ্ঠা, ধৈর্য, বিনয়, নম্রতা-ভদ্রতা, সময় সচেতনতা এসব মানবীয় গুণ এ পেশার জন্য খুব বেশি জরুরি। শিক্ষার্থীরা মা-বাবার চেয়েও বেশি প্রভাবিত হতে পারেন একজন শিক্ষকের দ্বারা। তাই শিক্ষকদের মধ্যে এসব গুণ থাকলে শিক্ষার্থীরাও এসব শিখতে পারে। আমরা মনে করি, একজন শিক্ষকের নিজের কাছেই নিজের জবাবদিহি করা উচিত। পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাস নেওয়া, অর্পিত কর্তব্য পালন করা, ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করতে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে প্রায়ই দেখা যায় ভিন্ন ধর্মের শিক্ষক হলেও তুচ্ছ ঘটনায় তাদের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়, যা বেদনাদায়ক। ফলে বিদ্যা মন্দিরে বিদ্যুতের আলো জ্বললেও মানুষের মাঝে নীতিনৈতিকতার আলো প্রবেশের পথ রুদ্ধ করে ফেলেছে, যা জাতিকে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ধাবিত করছে। এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি।

দেশে নীতিনৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতাই মূলত শিক্ষকদের ওপর আক্রমণের হীন পথ আবিষ্কার করছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে এখনও শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও বেতন কাঠামো খাটো করে রাখা হয়েছে, যা হতাশাজনক। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আছে স্থানীয় ক্ষমতাসীন সংগঠনের নেতাদের দৌরাত্ম্য। এর ফলে শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করছে শিক্ষার্থী, করছে লাঞ্ছিত! রাজনৈতিক ক্ষমতার মদদে শিক্ষকদের ওপর চলছে খবরদারি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টেন্ডার অবৈধভাবে দখল করার মতো ঘটনা ঘটছে। প্রতিকার আসেনি, যা দুঃখজনক। শিক্ষকদের বিচার না পাওয়ার সংস্কৃতি আমাদের পুরো শিক্ষকসমাজকে কঠিন এক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত করছে।

প্রকাশিত তথ্যমতে, ‘শিক্ষকদের ওপর হামলার নির্মম ঘটনা ঘটে বিগত ২০১৬ সালের মে মাসে। শ্রেণিকক্ষে ‘ধর্মীয় কটূক্তির’ অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে স্থানীয় সংসদ সদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর সারা দেশে নিন্দার ঝড় বয়ে গেলেও সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান অধরাই রয়ে যায়। সুষ্ঠু বিচার পাননি ওই শিক্ষক। একইভাবে এ বছরের এপ্রিল মাসে মুন্সীগঞ্জের গণিতের শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল আপন ছাত্রদের হাতে লাঞ্ছিত হন। তার বিরুদ্ধেও ধর্ম অবমাননার অভিযোগ করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য রাষ্ট্রীয় আইনে শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে গ্রেফতার করেছে নিরপত্তা বাহিনী। কিন্তু যারা উন্মাদনা ছড়াল, গুজবে ভারী করল জনপদ। তারা গ্রেফতার হলো না। বিচারের মুখোমুখি হলো না। শিক্ষকদের নিপীড়ন করে পার পাওয়া যায়। মুক্ত আকাশের নিচে ঘুরে বেড়ানোর সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেশি বেপরোয়া করেছে। জাতি গঠনের কারিগরদের করেছে শঙ্কিত। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আমেজের আড়ালে ঢাকা পড়ে নড়াইলের মির্জাপুর কলেজের অধ্যক্ষকে নিপীড়নের ঘটনা। শিক্ষক নিপীড়ন বেড়েছে । এখন শিক্ষকদের জুতার মালা গলায় পরিয়ে এলাকায় শোডাউন করা হয়। একইসঙ্গে আরও দুই শিক্ষক অরুণ মণ্ডল ও প্রশান্ত রায়ের ওপর বর্বর হামলা ও নির্যাতন চালানো হয়। তাদের মোটরগাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর শিক্ষককের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে কারাগারে প্রেরণ করে। এই রকম নির্যাতন-নিপীড়ন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি জাতির বিবেককে ধ্বংস করছে। এই পরিস্থিতি আগামী প্রজন্মের জন্য সুখকর ভবিষ্যৎ বয়ে আনবে কি? বরং বেপরোয়া, উন্মাদনা, গুজবপ্রিয় হুজুগে জাতিতে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে নির্বিঘ্নে। সাভারের শিক্ষক উৎপল কুমারকে শিক্ষার্থী পিটিয়ে মারলেও তার বিচারও হয়তো অধরাই রয়ে যাবে। আগামীতে তা দেখার অপেক্ষায় রইলাম। এমনকি রাজশাহীর তনোরের সংসদ সদস্য কর্তৃক কলেজ অধ্যক্ষ পেটানোর ঘটনা ঘটেছে।

আমরা মনে করি, শিক্ষক মর্যাদা নিয়ে বাঁচলে নতুন প্রজন্ম মর্যাদাবান হবে। শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে; শিক্ষা বাঁচলে দেশ বাঁচবে। দেশব্যাপী শিক্ষকদের বৈধ অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষা করা, শিক্ষকদের জীবনের মান উন্নত করা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি এবং শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে। অনুরূপভাবে শিক্ষার্থীদের সঠিক চরিত্র গঠনে লেখাপড়ার পাশাপাশি শিষ্টাচার, ভদ্রতা, সত্যবাদিতা, বিনয়, কর্তব্যপরায়ণতা প্রভৃতি গুণাবলি অর্জন করে সৎ চরিত্র গঠন করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবারকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা ছাত্রজীবনই শৃঙ্খলা অনুশীলনের সর্বোত্তম সময়। মানবজীবনকে সুন্দর ও সার্থক করে তুলতে হলে প্রয়োজন নিয়মের শাসন। ছাত্রজীবন শৃঙ্খলাবোধ চর্চার একটি উত্তম ক্ষেত্র। প্রত্যেক ছাত্রকে একটি যথাযথ নিয়মের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখে সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, শিষ্টাচার, মানবপ্রীতি জাগ্রত করা, সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, সৌহার্দবোধ প্রভৃতি গুণাবলি অর্জন করতে সচেষ্ট হতে হবে। কেননা নৈতিক মূল্যবোধ মানব চরিত্রকে করে তোলে সার্থক ও সুষমামণ্ডিত। প্রকৃত শিক্ষা ছাত্রজীবনে এ মূল্যবোধ গঠন করে। শিক্ষার বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগে গঠিত মূল্যবোধ একজন ছাত্রকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে। তার সুকুমার বৃত্তিগুলো বিকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। শ্রদ্ধা, ভক্তি, সম্মান, ভালোবাসা প্রভৃতি ছাত্রজীবন থেকেই নৈতিক মূল্যবোধকেই সুদৃঢ় করে। এ ছাড়াও আমরা মনে করি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই এ শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা প্রদানে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। সর্বোপরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথাযথ শৃঙ্খলা মেনে পরিচালনা করতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার সামাজিক সুবিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা অতীব জরুরি। শিক্ষকের মর্যাদা সমুন্নত রাখাই আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

জনসংযোগ কর্মকর্তা, বিজিএমইএ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা