Home অর্থনীতি বীমা : স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর পেশা

বীমা : স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর পেশা

SHARE
মীর নাজিম উদ্দিন আহমেদ

পরিক্রমা ডেস্ক : স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই এই দেশে বীমা ব্যবসা প্রচলিত ছিল। সে সময় অনেক কোম্পানিই যৌথভাবে লাইফ এবং নন-লাইফ ব্যবসা পরিচালনা করত। পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তান মিলে অনেক বীমা কোম্পানির কার্যক্রম চালু ছিল। যাদের প্রধান কার্যালয় ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব পকিস্তানে তাদের প্রাদেশিক শাখা অফিস ছিল। এমনি আলফা বীমার প্রাদেশিক শাখার প্রধান হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬০ সালের ১ মার্চ বীমা পেশায় তার কার্যক্রম শুরু করেন এবং এই পেশায় কর্মরত থাকা অবস্থায়ই তিনি ৬ (ছয়) দফা সনদ রচনা করেন- যা বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের সূচনা স্তম্ভ। এ হিসেবে বীমা পেশা যে অত্যন্ত সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

স্বাধীনতা লাভের পর বীমাকে জাতীয়করণ করা হয় এবং ১৯৮৪ সালে বীমাকে রাষ্ট্রীয়করণের পাশাপাশি বেসরকারিকরণও করা হয়। যার ফলে, আমরা নতুন প্রজন্ম বীমা শিল্পে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি হিসেবে আমরা আজ সোনার বাংলা বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছি।

আমরা যারা বীমা পেশায় জড়িত আছি আমাদের অনেকেই এটাকে পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে পারছি না। এখানে অপেশাদারিত্ব কাজ করছে- যা অন্য কোনো পেশায় দেখা যায় না। যদি বীমা পেশাজীবী হিসেবে নিজেদের পেশার প্রতি আমরা সম্মান প্রদর্শন না করি তবে অন্যেরা কেন আমাদের প্রতি সম্মান দেখাবেন? তা ভেবে দেখার সময় এসছে।

আমাদের নিজেদের পেশাকে সম্মান দেখাতে হবে। পেশাকে উপভোগ করতে হবে ও নতুনদের এই পেশায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে, তবেই পেশার উৎকর্ষ সাধিত হবে এবং শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম বীমা পেশার প্রতি আকর্ষিত হবে। তাদের বীমা পেশার প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা ও আনুসঙ্গিক সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেয়া বীমা শিল্পের সঙ্গে জড়িত সবার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

আমাদের নীতি, নৈতিকতা ও সততার সঙ্গে পরিচালিত হতে হবে। ‘আমি নয়, আমরা’ এই স্স্নোগানকে বুকে ধারণ করে নিজেদের কোম্পানিও পুরো বীমা শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। নিজের কোম্পানির বা একক ব্যক্তির উন্নয়নে বীমা শিল্পের মোটেও উন্নতি হবে না। শিল্পের উন্নয়নে সমষ্টিগতভাবে সবার অংশ গ্রহণ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে গত ৭ আগস্ট ২০২২ বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে চেয়ারম্যান মহোদয়ের সভাপতিত্বে আইডিআরএ-এর সব সদস্য এবং ইন্সু্যরেন্স ফোরামের কার্যকরী সদস্যদের নিয়ে বীমা শিল্পের সমস্যা ও সমাধানের উপায় এবং পন্থা নিয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনান্তে জানা যায়, বীমা শিল্পের সমস্যা দূরীকরণের লক্ষ্যে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রোড ম্যাপ তৈরি করছেন। আমরা তাদের এই মহতী কার্যক্রমকে সাধুবাদ জানাই।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সব কোম্পানিকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে এবং পাশাপাশি বুদ্ধি, পরামর্শ ও শাসনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে। তা-না হলে ইতিমধ্যে যারা অনৈতিক পন্থায় মার্কেট অস্থির করে তুলেছে সময় মতো তাদের শাসন না করতে পারলে তারা আরো মহা অস্থিরতায় গোটা শিল্পকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে। এখনই লাগাম টেনে ধরার সময়। বহু বছর পর বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বর্তমানে পূর্ণ কোরাম নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তাই এটাই উপযুক্ত সময়।

আমরা যারা বীমা পেশায় জড়িত আছি সবাই মানবেতর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। চাকরির অনিশ্চয়তায় ভুগছি। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মন্দায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে আমরা দিশেহারা। তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কারণে নৌ-বীমার প্রিমিয়াম কমে যাওয়ায় ব্যবসা সংগ্রহে আমরা সবাই কমবেশি অনৈতিক পথে চলে যাচ্ছি। তাই পেশাদারিত্ব রক্ষায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ তাদের বুদ্ধি, বিবেচনা ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে মার্কেট নিয়ন্ত্রণে কৌশল প্রয়োগ করবেন বলে আশা রাখি।

আমাদের দেশে বীমা ব্যবসা যেমনভাবে ব্যবসায়িদের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ঠিক তেমনি আমাদের অর্থাৎ বীমা পেশাজীবীদের কারণেও অসম প্রতিযোগিতাপূর্ণ। এটার একটি কারণ, বীমা পেশার প্রতি আমাদের ঔদাসিন্যতা ও পেশা সম্পর্কে পুঁথিগত জ্ঞানের অভাব। তাই বীমা শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বীমায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরির উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। এই জন্য বাংলাদেশ ইন্সু্যরেন্স একাডেমিকে কার্যকর ও যারা একাডেমি থেকে ডিপেস্নামা ডিগ্রি নিয়েছেন তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। বিভিন্ন বীমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মানবিক ও আর্থিক সাপোর্টের ব্যবস্থা, সরকারকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বীমা কি? তার প্রয়োজনীয়তা কি ইত্যাদি বুঝাতে পাঠ্যপুস্তকে বীমা সম্পর্কে জ্ঞান দানের উদ্যোগ নিতে হবে যাতে পরবর্তী সময়ে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বীমা বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বীমায় চাকরি করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়।

আমরা শুধু বীমা ব্যবসা সংগ্রহকে আমলে নেই কিন্তু শিক্ষা, সচেতনতা, সেবা ও আর্থিক সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নেই না। তাই বীমা করার পর কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে, বীমা গ্রহীতার ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে ভুলে যাই। পরবর্তী সময়ে কোম্পানি বীমা গ্রাহকের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ না করতে পারাতে পুরো বীমা শিল্পের দুর্নাম হয়, তা থেকে বের হয়ে আসার উদ্যোগ আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে।

আশাবাদ হলো, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই শুভ কাজে বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাগণেরও তাদের কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এখন পূর্ণ কেবিনেট নিয়ে কাজ করছেন। সবে মাত্র নতুন চেয়ারম্যান মহোদয় ও লাইফ এবং নন-লাইফ দুইজন সদস্য যোগদান করেছেন। পূর্বের দুইজন সদস্য যথাক্রমে আইন ও প্রশাসন বিদ্যমান আছেন। তাদের সম্মিলিত প্রয়াস এবং বীমা কোম্পানিতে কর্মরত সব মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও ফোরামের নেতারাসহ সবার সহযোগিতায় বীমা শিল্প কীভাবে দূষণমুক্ত হতে পারে ও শিক্ষিত লোকজনকে বীমা শিল্পের প্রতি আকর্ষিত করা যায় এবং বর্তমানে বীমা শিল্পে কর্মরত সবার মান, সম্মান ও ইজ্জত নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত পথে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারেন তার দিকনির্দেশনা প্রদানে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের আশু দৃষ্টি কামনা করছি।

মীর নাজিম উদ্দিন আহমেদ : ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্সু্রেন্স কোং লি. 

SHARE