Home ক্যাম্পাস খবর কুমারখালীর মেধাবী রাজুর পাশে ‘স্বপ্ন’, দিল সাড়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা

কুমারখালীর মেধাবী রাজুর পাশে ‘স্বপ্ন’, দিল সাড়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা

8
0
SHARE

অর্থাভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও পড়াশোনা থমকে যেতে বসেছিলো কুষ্টিয়ার কুমারখালীর তরুণ ওমর ওসমান রাজুর। তাঁর এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন যখন বাধার মুখে, তখনই রাজুর পাশে দাঁড়িয়েছে কয়েকটি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।

বৃহস্পতিবার সকালে রাজুর হাতে তিন লাখ ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে দিয়েছে স্বপ্ন সুপার শপ পরিবার। একই দিন দুপুরে তাঁর জন্য মাসিক পাঁচ হাজার টাকার শিক্ষাবৃত্তির ঘোষণা দিয়েছে আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন।

কুমারখালীর সদকী ইউনিয়নের মহিষাখোলা গ্রামের মৃত খবির উদ্দিন ও গৃহিণী ফাতেমা খাতুন দম্পতির বড় ছেলে ওমর ওসমান রাজু। তিনি ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে গুচ্ছ, জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। রাজুর ছোট ভাই মো. রাফিউল পড়ছেন একটি মাদ্রাসায়।

রাজুকে নিয়ে বৃহস্পতিবার দৈনিক সমকালে ‘ছেলে পড়াশোনা করতে চায়, কিন্তু আমি পারতিছি নে’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়, রাজু উপজেলার জিডি শামছুদ্দিন আহমেদ কলেজিয়েট স্কুল থেকে ২০২৩ সালে বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে জিপিএ ৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৯২ পয়েন্ট পেয়ে এইচএসসিতে উত্তীর্ণ হন।

এরপর তিনি কুষ্টিয়ার একটি কোচিং সেন্টারে এক শিক্ষককের সহযোগিতায় বিনামূল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শেষ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির গুচ্ছ পরীক্ষায় ৯০তম, জাহাঙ্গীরনগরে ২৫১তম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪৩তম মেধাস্থান অর্জন করেছেন রাজু। তবে অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় রাজুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

রাজু যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়েন, তখনই কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বাবা খবির উদ্দিন। এরপর থেকে তাঁর মা ফাতেমা খাতুন অন্যের বাড়িতে কাজ করে তিনজনের সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন।

অর্থাভাবে রাজুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার অনিশ্চয়তা নিয়ে সমকালসহ কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হয়। পরে বিষয়টি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নজরে পড়লে স্বপ্ন সুপার শপ, আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেনসহ বিভিন্ন সংগঠন ও বিত্তবান ব্যক্তিরা এগিয়ে আসেন।

বৃহস্পতিবার সকালে রাজুর বাড়িতে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে স্বপ্নের চেক নিয়ে চেয়ারে বসে আছেন মা-ছেলে। তাঁদের চোখে আনন্দের অশ্রুজল। এ সময় আবেগে আপ্লুত ফাতেমা খাতুন বলেন, ‘সংসারে ইনকামের লোক নাই। কাপড়-চোপর, বই-খাতা, খাতি দিতি পারিনে। কত করে কয়ছি তুই পড়িসনে। ও কয় তাউ পড়বই। এসব কথা খবরে উঠে গেলি অনেকই ফোন দিচ্ছে। স্বপ্ন ওয়ালারা সাড়ে তিন লাখ টাহার চেক দিছে। আলাউদ্দিন স্যার ফোন দিছেন। এহন খুব খুশি। সগলে আমার রাজুর জন্যি দোয়া করবেন।’

স্বপ্ন সুপার শপের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক রাসেল আল মামুন বলেন, পত্রিকা ও ফেসবুকে মেধাবী রাজুর সংগ্রামী জীবনের একটি প্রতিবেদন এমডি স্যারের নজরে আসে। তখন স্বপ্ন পরিবারের পক্ষ থেকে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার জন্য সাড়ে তিন লাখ টাকার চেক দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও স্বপ্ন পরিবার রাজুর পাশে থাকবে।

এদিন দুপুরে আলাউদ্দিন আহমেদ শিক্ষা পল্লী পার্কের একটি সভাকক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজুর হাতে প্রথম মাসের নগদ পাঁচ হাজার টাকা তুলে দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল লতিফ, ফাউন্ডেশনটির সভাপতি মো. মুরাদ হোসেন, রাজুর মা প্রমুখ। এছাড়াও বিভিন্ন স্থান জায়গা থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় ২১ হাজার টাকা এসেছে রাজুর বিকাশ নম্বরে। তিনি জানিয়েছেন, অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

মানুষের এই এগিয়ে আসায় কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন রাজু। দুপুরে রাজু বলেন, ‘তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেও অর্থাভাবে পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। এরপর আমাকে নিয়ে একটি সংবাদ প্রচার হলে অসংখ্য মানুষ ফোনে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন। স্বপ্ন সুপার শপ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার চেক ও আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন থেকে প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকার বৃত্তি দিয়েছে। এখন আর টাকার সমস্যা নেই। পড়াশোনা করে মানুষ হওয়ার স্বপ্ন বেঁচে রইল। সকলের ভালোবাসা ও সহযোগিতায় মুগ্ধ ও কৃতজ্ঞ আমি।’

তিনি জানিয়েছেন, ৫ এপ্রিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হতে যাবেন। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ডিসি অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা আছে। তবে ভবিষ্যতে অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্নটা রাজু বুকেই লালন করবেন।

আলাউদ্দিন ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. মুরাদ হোসেন বলেন, গণমাধ্যমে সংবাদ পেয়ে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে রাজুকে শিক্ষাকালীন মাসিক পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রথম মাসের টাকাটা রাজুর হাতে নগদ তুলে দেওয়া হয়েছে। আগামী মাসগুলোর টাকা তাঁর ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে দেওয়া হবে। এছাড়াও রাজুকে দুই সেট পোশাক দেওয়া হচ্ছে।

এসব তথ্য নিশ্চিত করেন কুমারখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের কল্যাণে অদম্য মেধাবী রাজুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। রাজুদের মতো সকল মেধাবীদের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসতে সমাজের সকল বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ট্যাগ :

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

image_pdfimage_print