Home আইন/আদালত আইনে ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু যোগ্যতার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই”

আইনে ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু যোগ্যতার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই”

250
0
SHARE

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য নির্বাচন—কোনো পর্যায়ের নির্বাচনেই প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা বা নির্দিষ্ট কোনো ডিগ্রি বাধ্যতামূলক নয়। আইন ও সংবিধান দেশের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং ভোট দেওয়ার সমান অধিকার দিয়েছে। তাই কেবল শিক্ষাগত সনদ না থাকার কারণে একজন নাগরিককে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যায় না।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রশাসনের সব স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণই আমাদের গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি।

আবার সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান এবং তারা আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। এই সাংবিধানিক নীতিই প্রত্যেক নাগরিককে সমান সুযোগ প্রদানের ভিত্তি তৈরি করেছে।

এ ছাড়া, সংবিধানের ৬৬ নম্বর অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বয়স ও নাগরিকত্বসহ কিছু মৌলিক শর্ত থাকলেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত ডিগ্রিকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। এর মাধ্যমে সংবিধান জনগণের ওপরই আস্থা রেখেছে যে, তারা ভোটের মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচিত করবে।

তবে একটি বিষয় আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে—আইন যখন ডিগ্রিকে বাধ্যতামূলক করেনি, তখন তার অর্থ এই নয় যে যোগ্যতার প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। গণতন্ত্রে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার সকলের থাকতে পারে, কিন্তু নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব কেবল সেই ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া উচিত, যিনি জনগণের আস্থা ও যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন।

একজন ভালো জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য শুধু উচ্চশিক্ষিত হওয়াই যথেষ্ট নয়। একজন মানুষের সততা, দেশপ্রেম, নেতৃত্বের গুণাবলি, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সমাজের জন্য কাজ করার মানসিকতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত কোনো ব্যক্তি সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যা ও চাহিদা বুঝতে ব্যর্থ হন। আবার এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই, কিন্তু তাঁরা দীর্ঘদিন মানুষের পাশে থেকে সমাজের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তব জীবন, মানুষের সঙ্গে চলাফেরা, সমাজের নানা অভিজ্ঞতা এবং মানুষের সুখ-দুঃখকে উপলব্ধি করার মধ্যেও অনেক বড় শিক্ষা নিহিত রয়েছে। একজন প্রকৃত জনপ্রতিনিধির মধ্যে এই গুণগুলোর উপস্থিতি অত্যন্ত প্রয়োজন।

তবে আমরা এখন এমন এক যুগে বসবাস করছি, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনা, স্থানীয় সরকার, বাজেট, প্রযুক্তি, আইন এবং নাগরিক সেবার সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই জনপ্রতিনিধির প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি থাকুক বা না থাকুক, তাঁর ন্যূনতম জ্ঞানগত সক্ষমতা এবং সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে সচেতনতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে একজন জনপ্রতিনিধিকে শুধু জনপ্রিয় হলেই চলবে না। তাঁকে অন্তত রাষ্ট্র ও সংবিধান সম্পর্কে মৌলিক ধারণা রাখতে হবে। নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর সরকারি সেবা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান থাকতে হবে। তথ্য যাচাই ও যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা থাকতে হবে। জনগণের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও জবাবদিহিতার মানসিকতাসহ প্রয়োজনীয় নেতৃত্বগুণ অর্জন করতে হবে।

আমরা ডিগ্রিকে বাধ্যতামূলক করতে বলছি না; আমরা যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিতে বলছি। কারণ একজন মানুষের হাতে যদি হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ, উন্নয়ন ও অধিকার রক্ষার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়, তাহলে তাঁর মধ্যে ন্যূনতম নেতৃত্বগুণ, জ্ঞান এবং দায়িত্বশীলতা থাকা জনগণের ন্যায্য প্রত্যাশা।

তাই আইন যখন প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ডিগ্রিকে বাধ্যতামূলক করেনি, তখন একজন যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এসে পড়ে ভোটারের ওপর। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি এলাকা, একটি সমাজ এবং হাজারো মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করেন।

ভোট দেওয়ার সময় আমাদের কোনো প্রার্থীর বাহ্যিক চাকচিক্য, জনপ্রিয়তার প্রচারণা কিংবা মিষ্টি কথায় প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়। আমাদের দেখতে হবে—তিনি কতটা সৎ, মানুষের জন্য কতটা কাজ করেছেন, তাঁর চরিত্র কেমন এবং তিনি বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী জনগণের কল্যাণে কাজ করার যোগ্য কি না।

মনে রাখতে হবে, ভোট …

image_pdfimage_print