
রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস ও আসন্ন ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচন থেকে সরাতেই গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
রাজধানীর পল্লবী থানা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মো. আনিসুর রহমান ও মিরপুরের আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের কথিত একটি ফোনালাপের অডিও রেকর্ড সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে প্রচারিত এই অডিওটি সম্পূর্ণ ‘ভুয়া, বানোয়াট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি’ (ডিপফেক বা ভয়েস ক্লোন) বলে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপি নেতা আনিসুর রহমান। তাঁর দাবি, আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে তাঁর সম্ভাব্য প্রার্থিতা নস্যাৎ করতে এবং রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যেই প্রতিপক্ষ মহল এই অপপ্রচার চালাচ্ছে।
সম্প্রতি ফেসবুক, টিকটকসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই কথিত অডিও রেকর্ডে দুই ব্যক্তির মধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রজেক্টের নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সহায়তা এবং দলীয় প্রভাব খাটানো নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। নেটিজেনদের একাংশ দাবি করছেন, ফোনালাপের এক প্রান্তে ছিলেন পল্লবী থানা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মো. আনিসুর রহমান এবং অন্য প্রান্তে ছিলেন বিদেশে পলাতক মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত।
ভাইরাল অডিওতে যা শোনা যায়
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া প্রায় ৩৭ সেকেন্ডের ওই সংক্ষিপ্ত অডিও ক্লিপটিতে দুই ব্যক্তির মধ্যে কথোপকথন হতে শোনা যায়। সেখানে প্রথম বক্তাকে বলতে শোনা যায়—
“হইছে, ঐ যে… এখন আমার কথা হইলো, আমার কি করতে হইবো? আমিনুল ভাইরে আমার সালাম দিয়েন। বইলেন, আমরা কী করতে পারবো?”
এর জবাবে অপর প্রান্তের দ্বিতীয় বক্তা সালাম দিয়ে বলেন—
“আসসালামু আলাইকুম। …তবে তারা যাতে একচেটিয়া না খাইতে পারে, একচেটিয়া না খাইতে পারে—ঐ ব্যবস্থা করেন।”
উত্তরে প্রথম বক্তা পুনরায় বলেন—
“তো সেটা তো করমু। বললাম তো আপনি যোগাযোগ রাইখেন। আরও আমাদের দলীয় লোকজন যারা আছে, তাদের সাথে রাইখেন। আর আমিনুল ভাইরে বইলেন আমাদের হেল্প করতে, প্রশাসনিকভাবে যেমন হেল্প করে উনি। আমাদের ছেলেপেলের কোনো কিছু হইলে… আমার কথা বুঝতে পারছেন? তাইলে ঐ ভাইরে কমু যে, ঐ যে তারেকের ইয়া প্রজেক্ট, যে প্রজেক্ট আছে, গার্মেন্টস আছে—এগুলি আমরা লোক দিয়া করাবো। কিন্তু ওনার প্রশাসন দিয়া হেল্প করতে হবে।”
কথোপকথনের শেষাংশে অপর প্রান্ত থেকে দ্বিতীয় বক্তা সংক্ষেপে বলেন, “আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে।”
এই অডিওটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই মিরপুর ও পল্লবী এলাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
আনিসুর রহমানের তীব্র প্রতিবাদ ও বক্তব্য
কথিত ওই ফোনালাপকে সম্পূর্ণ অসত্য, ভিত্তিহীন এবং প্রযুক্তিগত জালিয়াতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন পল্লবী থানা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মো. আনিসুর রহমান। এক বিবৃতিতে ও গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার কণ্ঠের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের যে কথিত কল রেকর্ড ভাইরাল করা হয়েছে, তা শতভাগ এআই জেনারেটেড (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা প্রস্তুতকৃত)। আমি এমন কোনো কথা কখনো বলিনি এবং বাস্তব জীবনে শাহাদাত নামের কোনো সন্ত্রাসীর সঙ্গে আমার কোনো দিন কোনো ধরনের যোগাযোগ বা কথা হয়নি।”
তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “আমি শহীদ জিয়ার আদর্শ এবং দেশনেত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচ্ছন্ন ও দায়িত্বশীল রাজনীতি করে আসছি। পল্লবী ও মিরপুরের মানুষ জানে আমি চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কখনো যুক্ত ছিলাম না। একটি বিশেষ রাজনৈতিক কুচক্রী মহল আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং সাংগঠনিক অবস্থান নষ্ট করতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই ডিপফেক অডিও তৈরি করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছে।”
কাউন্সিলর নির্বাচন ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
নিজের বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচারের নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করে আনিসুর রহমান বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে পল্লবী এলাকার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে আছি। আগামী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে আমি কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছি। সাধারণ মানুষের মাঝে আমার যে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে, তাতে একটি বিশেষ প্রতিপক্ষ গোষ্ঠী চরম ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমাকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ঘায়েল করতে না পেরে, মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত হিসেবেই এই নোংরা কৌশল বেছে নেওয়া হয়েছে। যাতে করে দল আমার ওপর আস্থা হারায় এবং আমি নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়ি। এটি শুধু আমার একার বিরুদ্ধে নয়, বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করারও একটি ঘৃণ্য অপচেষ্টা।”
দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান
আনিসুর রহমান দাবি করেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটি স্বার্থান্বেষী মহল মিরপুর-পল্লবী এলাকায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের জড়িয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। দলের অভ্যন্তরে কোন্দল ও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করার জন্য নানা ধরনের প্রযুক্তিগত জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। তিনি দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে এ ধরনের ভুয়া তথ্যে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জানান। পাশাপাশি দলের হাইকমান্ডকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “দলের প্রতি আমার আনুগত্য প্রশ্নাতীত। যেকোনো নিরপেক্ষ তদন্তের মুখোমুখি হতে আমি প্রস্তুত।”
প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ ও আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতিতে ডিপফেক অডিও ও ভিডিওর ব্যবহার মারাত্মক রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন সাইবার বিশেষজ্ঞরা। মানুষের পুরনো কোনো বক্তব্যের কণ্ঠের নমুনা সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI Voice Cloning) সফটওয়্যারের মাধ্যমে হুবহু কণ্ঠ নকল করে যেকোনো মনগড়া সংলাপ তৈরি করা এখন সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা নির্বাচন বানচাল করতে এমন অপপ্রচারের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, তিনি এ বিষয়ে চুপ থাকবেন না। ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে তিনি আইনি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করছেন। তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে পেজ ও আইডিগুলো থেকে এই এআই জেনারেটেড ভুয়া অডিও ছড়ানো হয়েছে, সেগুলোর লিংক ও প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। খুব দ্রুতই আমি পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা/সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করব। একইসঙ্গে এ ধরনের সাইবার অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
এদিকে পল্লবী থানা বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ আনিসুর রহমানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় কোনো নেতাকে বিতর্কিত করতে প্রযুক্তিকে হাতিয়ার বানানো একটি নোংরা সংস্কৃতি। অবিলম্বে এ ধরনের বানোয়াট প্রচার বন্ধ না হলে স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচির কথাও ভাবছেন তারা।






