Home Fashion শিক্ষাই জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ: রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিক্রমার উদ্যোগে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি...

শিক্ষাই জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ: রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিক্রমার উদ্যোগে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

9
0
SHARE

মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে ক্রেস্ট ও সনদ প্রদান, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান

রাজশাহী ব্যুরো:

দেশের শিক্ষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা মাসিক শিক্ষা-অর্থনীতি বিষয়ক পত্রিকা ‘বিশ্ববিদ্যালয় পরিক্রমা’-এর উদ্যোগে রাজশাহী বিভাগের ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়া, উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করা, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে উৎসাহ প্রদান এবং শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করার লক্ষ্যে এই ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন করা হয়।

শনিবার (২০ জুন ২০২৬) বিকেল ৩টায় রা

জশাহী মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলার শত শত কৃতি শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের ব্যক্তিত্ব এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ, প্রাণবন্ত আলোচনা এবং নতুন প্রজন্মকে ঘিরে আশাবাদের বার্তা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. এম. ছায়েদুর রহমান  এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেনরাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. ফয়সল আলম, রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম, রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মো. এরশাদ আলী ঈশা, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আলী আসলাম হোসেন, , রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. ইব্রাহিম আলী, নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. শিখা সরকারসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয় পরিক্রমার সম্পাদক হারুন অর রশিদ

শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু বলেন, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো দক্ষ মানবসম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হলেও শিক্ষিত, মেধাবী ও দক্ষ জনগোষ্ঠী একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। আজ যারা জিপিএ-৫ অর্জন করেছে, তারা শুধু নিজেদের পরিবার নয়, পুরো দেশের গর্ব। তাদের হাত ধরেই আগামী দিনের বাংলাদেশ আরও সমৃদ্ধ ও উন্নত হবে।

তিনি বলেন, “আজকের এই মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়ক, প্রশাসক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিচারপতি, শিক্ষক, গবেষক ও উদ্যোক্তা তৈরি হবে। তাই তাদের শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; দেশপ্রেম, সততা, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ আজ প্রযুক্তি, অবকাঠামো, কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে নতুন প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে হলে গবেষণা, উদ্ভাবন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক খাতে এগিয়ে যেতে হবে।”

ভালো ফলাফলই শেষ কথা নয়

অনুষ্ঠানের উদ্বোধক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন বলেন, “জিপিএ-৫ অর্জন নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। তবে জীবনের সফলতা কেবল একটি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। সফলতার জন্য প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, সততা, আত্মবিশ্বাস এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।”

তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আজ তোমরা যে সম্মাননা গ্রহণ করছো, তা তোমাদের দায়িত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে। তোমাদের অর্জনকে ধরে রাখতে হবে এবং দেশের কল্যাণে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।”

তরুণদের সামনে যেমন সুযোগ, তেমনি চ্যালেঞ্জও রয়েছে

প্রধান আলোচক সাইদুর রহমান খান বলেন, বর্তমান যুগ তথ্য ও প্রযুক্তির যুগ। পৃথিবী এখন একটি বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের সামনে যেমন অসীম সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, মাদকাসক্তি, সাইবার অপরাধ, জঙ্গিবাদ ও নৈতিক অবক্ষয় তরুণ সমাজের জন্য বড় হুমকি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নিজেদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন করলেই হবে না; তাদের মধ্যে নেতৃত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা, গবেষণার মানসিকতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে।”

শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়

বিশেষ অতিথি প্রফেসর ড. এম. ছায়েদুর রহমান বলেন, “একটি দেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা। শিক্ষা মানুষকে শুধু কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলে না, বরং তাকে একজন দায়িত্বশীল ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।”

তিনি বলেন, “বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে হবে না। গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সামাজিক সমস্যার সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।”

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আলী আসলাম হোসেন বলেন, “মাদক একটি জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেয়। তরুণ সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।”

তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “তোমরাই পারো মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে। নিজেদের সচেতন রাখো এবং অন্যদেরও সচেতন করো।”

অভিভাবক ও শিক্ষকদের অবদান স্মরণ

জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, “একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে পরিবারের ত্যাগ, শিক্ষকদের পরিশ্রম এবং সমাজের সহযোগিতা জড়িত থাকে। তাই এই অর্জন শুধু শিক্ষার্থীর একার নয়; এটি পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও অর্জন।”

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. ফয়সল আলম বলেন, “ভালো ফলাফল একজন শিক্ষার্থীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও প্রকৃত সফলতা তখনই আসে, যখন সেই জ্ঞান সমাজ ও দেশের কল্যাণে কাজে লাগানো হয়।”

রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. ইব্রাহিম আলী বলেন, “শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু চাকরি পাওয়া নয়; শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মানুষ হওয়া। একজন শিক্ষিত মানুষ সমাজকে আলোকিত করতে পারে।”

নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. শিখা সরকার বলেন, “শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি করতে হবে। তাহলেই একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।”

কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান। রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের হাতে ক্রেস্ট, সনদপত্র ও সম্মাননা স্মারক তুলে দেন অতিথিরা। এ সময় অডিটোরিয়ামজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

শিক্ষার্থীরা তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, এই সম্মাননা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা যোগাবে। তারা দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগানোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

অনেক শিক্ষার্থী জানান, তারা ভবিষ্যতে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা ও প্রশাসক হিসেবে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে চান।

শিক্ষাবান্ধব সমাজ গঠনের প্রত্যয়

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের শুধু ভালো ফলাফল অর্জন করলেই হবে না; তাদেরকে দক্ষ, সৃজনশীল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতি, খেলাধুলা, সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমেও তাদের ব্যক্তিত্ব বিকশিত করতে হবে।

বক্তারা আরও বলেন, মেধাবী শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং উৎসাহ প্রদান করলে তারা ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য অর্জনে উদ্বুদ্ধ হবে। তাই রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় পরিক্রমার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

অনুষ্ঠানে বক্তারা বিশ্ববিদ্যালয় পরিক্রমার এ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা বলেন, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে এমন আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে এবং তাদের ভবিষ্যৎ পথচলায় অনুপ্রেরণা জোগাবে।

আয়োজকরা জানান, দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা, শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো এবং শিক্ষাবান্ধব সমাজ গঠনের লক্ষ্যে ভবিষ্যতেও আরও বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

পরে দেশের সমৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং জাতির কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠান শেষে অতিথিবৃন্দ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে স্মৃতিচারণমূলক ফটোসেশন অনুষ্ঠিত হয়।

রাজশাহীর শিক্ষাঙ্গনে আয়োজিত এই বৃহৎ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শুধু মেধাবী শিক্ষার্থীদের সম্মানিত করাই নয়, বরং শিক্ষা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন একটি নতুন প্রজন্ম গঠনের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ আগামী দিনের নেতৃত্ব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং তরুণ সমাজকে দেশগঠনের কাজে আরও বেশি সম্পৃক্ত করবে।

image_pdfimage_print